Search This Blog

Saturday, February 7, 2026

History 4th sem

 VIVEKANANDA COACHING CENTRE

CLASS:- XII, SEM:- 4TH

SUB:- HISTORY

1. সংহ্মেপে উত্তর দাও :- (Marks-3)

a) দ্বিজাতী তত্ব বলতে কী বোঝ ?

Answer:- দ্বিজাতি তত্ত্ব: দ্বিজাতি তত্ত্ব হল একটি রাজনৈতিক মতবাদ, যা ঔপনিবেশিক ভারতের রাজনীতি ও সমাজে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। দ্বিজাতি শব্দের অর্থ হল দুই জাতি। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ভারতে হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতি এবং তাদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বর্তমান। দুই জাতির ভাষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা, রাজনৈতিক লক্ষ্য সবকিছুই ভিন্ন।

দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রবক্তা: অনেক ঐতিহাসিকের মতে, সৈয়দ আহমেদ খানের তত্ত্ব থেকে প্রথম দ্বিজাতি তত্ত্বের আভাস মেলে। তবে পরবর্তীকালে মহম্মদ আলি জিন্নাহ-সহ বেশ কয়েকজন নেতা এই তত্ত্বের ব্যাপক প্রচার চালান।।

দ্বিজাতি তত্ত্বের বৈশিষ্ট্য

(i) ধর্মের অধিক গুরুত্ব : দ্বিজাতি তত্ত্বে ধর্মকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে হিন্দু ও মুসলমানকে জাতিগতভাবে আলাদা বলে বিবেচনা করা হয়।

(ii) রাজনৈতিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা: ঔপনিবেশিক শাসন কালে  মুসলমানদের একাংশ মনে করতেন যে তারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে হিন্দুদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। তাই তাঁরা রাজনৈতিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়।

(iii) সহাবস্থান অস্বীকার : এই তত্ত্ব অনুযায়ী, হিন্দু ও মুসলমান কখনোই একই রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণভাবে বাস করতে পারবে না। তাই উভয় সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রয়োজন।

(iv) পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি: ভারতে দ্বিজাতি তত্ত্বের যে প্রভাব পড়েছিল তার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ভারত বিভাজন ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি।

b) মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল?

Answer:- প্রাক্-স্বাধীন ভারতীয় রাজনীতির অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হল মুসলমানদের নিজস্ব রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে সর্বভারতীয় মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা।

সর্বভারতীয় মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠার পটভূমি/ প্রেক্ষাপট:

(i) মুসলমানদের সাংগঠনিক পরিস্থিতি:-

স্যার সৈয়দ আহমেদ খান জাতীয় কংগ্রেসকে হিন্দু সংগঠন বলে চিহ্নিত করেন। তিনি কংগ্রেসের বিরোধিতা করার কাজে মুসলমানদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন স্থাপন করেন। এই  মূল লক্ষ্য ছিল, ব্রিটিশ শাসনকে সুদৃঢ় করা এবং মুসলমান সমাজের স্বার্থরক্ষা। 

(ii) রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা:-

স্যার সৈয়দ আহমেদ খান ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে মুসলমান সমাজের উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণের চেষ্টা করেন। কিন্তু নতুন প্রজন্মের মুসলিম যুবনেতারা ব্রিটিশ সরকারের আন্তরিকতা বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন। এমতাবস্থায় সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখার তাগিদে হিন্দু ও ব্রিটিশ সরকার উভয়েরই বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হওয়া তথা একটি রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করার বিশেষ প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

(iii)  বঙ্গবিভাগের সিদ্ধান্ত :-

 লর্ড কার্জন কর্তৃক ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবিভাগের সিদ্ধান্ত মুসলমানদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। তাদের আশা ছিল, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে নতুন প্রদেশ গঠিত হলে পূর্ব বাংলায় মুসলিমদের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বঙ্গবিভাগের প্রধান কারিগর বাংলার ছোটোলাট ব্যাম্পফিল্ড ফুলার। আকস্মিক পদত্যাগ (২০ আগস্ট, ১৯০৬ খ্রি.) করলে মুসলমানদের মনে ভয় ধরে। তাঁরা ভাবতে শুরু করেন যে, হয়তো বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যাবে। ফলে মুসলিমরা নিজেদের দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য নিজস্ব দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

(iv) সিমলা দৌত্য: -

আলিগড় কলেজের সচিব মহসিন-উল-মুলক ইতিমধ্যে ঢাকার নবাব সলিমউল্লাহ-র সঙ্গে আলোচনা করে বড়োলাট লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্যোগ নেন। এ বিষয়ে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন আলিগড় কলেজের ইংরেজ অধ্যক্ষ মিস্টার আর্চবোল্ড এবং বড়োলাটের সচিব ডানলপ স্মিথ। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ১ অক্টোবর আগা খানের নেতৃত্বে ৩৫ জন সদস্যবিশিষ্ট মুসলিম প্রতিনিধি দল সিমলায় লর্ড মিন্টোর সঙ্গে দেখা করেন, যা সিমলা দৌত্য নামে খ্যাত।

(v) স্মারকলিপি পেশ:-

 লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুসলিম প্রতিনিধি দল তাঁর হাতে একটি স্মারকলিপি তুলে দেয়। এতে সরকারি চাকুরি এবং প্রতিনিধিমূলক প্রশাসনিক সংস্থায় সংখ্যালঘু হিসেবে হিন্দুদের সমানুপাতে মুসলিম প্রতিনিধি পাঠানোর দাবি করা হয়। লর্ড মিন্টো মুসলমান প্রতিনিধিদের কথা শোনেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে, পূর্ববঙ্গীয় মুসলমানদের স্বার্থ বিপন্ন হবে না।

● মুসলিম লিগ গঠন:-

 ঢাকার নবাব সলিমউল্লাহ-র উদ্যোগে স্যার সৈয়দ আহমেদ খান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মহামেডান এডুকেশন কনফারেন্স-এর বার্ষিক অধিবেশনের দিন স্থির হয় ঢাকা শহরে। এখানেই ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর মুসলমানদের জন্য একটি নতুন দল গঠিত হয়, যা সর্বভারতীয় মুসলিম লিগ বা অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ নামে পরিচিত। এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মনোনীত হন আগা খান এবং প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন মহসিন-উল-মুলক এবং ভিকার-উল-মুলক।

c) লহ্মৌ চুক্তি কী? লহ্মৌ চুক্তির উদ্দেশ্য কী ছিল?

Answer:- 1916 খ্রি: জাতীয় কংগ্রেসের লহ্মৌ অধিবেশন চলাকালীন চরমপন্থী নেতা বাল গঙ্গাধর তিলকের নেতৃত্বে কংগ্রেস ও মহম্মদ আলি জিন্নার নেতৃত্বে মুসলিম লিগের মধ্যে এক চুক্তি হয়, যার নাম 'লখনউ চুক্তি'। কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের মধ্যেকার যাবতীয় মতাদর্শগত বিভেদকে দূরে সরিয়ে রেখে পুনরায় ঐক্যবন্ধ হওয়ার লক্ষ্যেই এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । ঐতিহাসিক বিপান চন্দ্র তাঁর 'Modern India' গ্রন্থে লিখেছেন-হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ক্ষেত্রে লখনউ চুক্তি এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপরুপে চিহ্নিত ("The Lucknow Pact marked an important step forward in Hindu-Muslim unity')। 

● চুক্তির শর্তাবলি:-

1. কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ যুগ্মভাবে সরকারের কাছে শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি পেশ করতে সম্মত হয়। 

2. মুসলিম লিগ কংগ্রেসের 'স্বরাজ'-এর আদর্শ মেনে নেয়। 

3. কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের 'পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা'-র দাবি মেনে নেয়। স্থির হয় যে, প্রতিটি প্রাদেশিক আইনসভায় মুসলিম সদস্যদের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা হবে। 

4. কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের মোট সদস্যদের এক-তৃতীয়াংশ হবেন মুসলিম সদস্য।

● গুরুত্বঃ-  ঐতিহাসিক ড. বিপান চন্দ্রের মতে, হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ক্ষেত্রে লখনউ চুক্তি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিলক ও জিন্না এই চুক্তিকে স্বাগত জানান। এই চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের তিক্ততা ভুলে দুই প্রতিষ্ঠান মিলিত হয় এবং যুগ্মভাবে ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই চুক্তি প্রমাণ করে যে, পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও জাতীয় প্রয়োজনে দুই সম্প্রদায় মিলিত হতে পারে এবং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ কখনোই অনিবার্য নয়।

● সমালোচনা: - বহু রাজনৈতিক নেতা ও ঐতিহাসিক কর্তৃক লখনউ চুক্তি সমালোচিত হয়েছে।  ড. জুডিথ ব্রাউন বলেন যে, ঐক্যের কোনো সুদৃঢ় ভিত্তির উপর এই চুক্তি গড়ে ওঠেনি, বরং উভয়পক্ষের কয়েকজন রাজনীতিক নিজ স্বার্থে উভয় সম্প্রদায়ের ফাটলে কাগজের প্রলেপ দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। গান্ধিজির মতে, এই চুক্তি ছিল ধনী, শিক্ষিত হিন্দু এবং ধনী, শিক্ষিত মুসলিমদের মধ্যে একটি 'বোঝাপড়া' মাত্র। সাধারণ হিন্দু ও মুসলিম জনগণের সঙ্গে এই চুক্তির কোনো সম্পর্ক ছিল না।

d) জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় হিউম - ডাফরিন ষড়যন্ত্র তত্ব কী? Or, সেফটি ভালভ তত্ব কী?

Answer:- অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ কর্মচারী। আর তৎকালীন ভারতের বড়োলাট বা ভাইসরয় ছিলেন লর্ড ডাফরিন। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে সিমলায় ডাফরিন ও হিউমের সাক্ষাৎ হয়। বেশকিছু ঐতিহাসিক মনে করেন যে, এই সাক্ষাৎ এবং তাঁদের আলোচনার মধ্যে দিয়েই জাতীয় কংগ্রেস তৈরির পরিকল্পনা করা হয়, যা ইতিহাসে হিউম-ডাফরিন ষড়যন্ত্র নামে পরিচিত।

অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউমের  জীবনীকার উইলিয়ম ওয়েডারবার্ন রচিত Allan Octavian Hume: Father of the Indian National Congress  গ্রন্থ থেকে হিউমের কর্মকান্ডের কথা জানা যায়। কর্মসূত্রে তিনি সিমলাতে থাকাকালীন সময়ে সাত খণ্ডের এক গোপন দলিল দেখার সুযোগ পান। সেগুলি পড়ে তিনি বুঝতে পারেন যে, ব্রিটিশ শাসনের চাপে জর্জরিত ভারতের সাধারণ ও নিম্নশ্রেণির মানুষেরা যে-কোনো সময় ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারে। এই বিদ্রোহ থেকে দেশের শিক্ষিত সম্প্রদায়কে দূরে রেখে তাঁদের মতামতকে একটি নিয়মতান্ত্রিক পথে পরিচালিত করার জন্য হিউম জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন। হিউমের উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় কংগ্রেসকে ব্রিটিশ সরকারের স্বার্থে সেফটি ভাল্ভহিসেবে ব্যবহার করা। হিউম । এই সামগ্রিক ধারণাই সেফটি ভাল্ভ তত্ত্ব (Safety Valve Theory) নামে পরিচিত।

● সেফটি ভাল্ড তত্ত্বের সমর্থন :- 

সাম্প্রতিক নানা গবেষণায় সেফটি ভাল্ভ তত্ত্বের অসাড়তা তুলে ধরেছেন বিপানচন্দ্র, অমলেশ ত্রিপাঠি, সুমিত সরকার-এর মতো ঐতিহাসিকগণ। তাঁদের প্রদত্ত যুক্তিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-

সিমলায় অবস্থানকালে হিউম সাত খন্ড গোপন রিপোর্ট দেখার সুযোগ পান বলে ওয়েডারবার্ন দাবি করেছেন। কিন্তু বিপানচন্দ্র ও অন্যান্যরা দিল্লি বা লন্ডনের মহাফেজখানায় (তথ্যাগার) তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ওই নথির অস্তিত্ব দেখতে পাননি।

ওয়েডারবার্ন বলেছেন যে, ওই সকল গণ অসন্তোষের তথ্য প্রায় ৩০ হাজার প্রতিবেদক সংগ্রহ করেছিলেন। এই সংখ্যা অবাস্তব।

১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে হিউম ছিলেন রাজস্ব ও বাণিজ্য বিভাগের সচিব। তাঁর দফতর ছিল সিমলাতে। স্বভাবতই স্বরাষ্ট্র দফতরের গোপন তথ্য জানার সুযোগ তাঁর ছিল না।

পরিশেষে বলা যায় যে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে হিউম ও সেফটি ভাল্ভতত্ত্বের ধারণা গভীরভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু, তা সত্ত্বেও পুরোপুরিভাবে কংগ্রেসকে ব্রিটিশ শাসনের স্বার্থে গড়ে তোলা একটি সংগঠন বলা যুক্তিযুক্ত হবে না।

e) সত্যাগ্রহের আদর্শ বলতে কী বোঝ?

Answer:- দক্ষিণ আফ্রিকায় গান্ধিজি বর্নবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এক অভিনব কৌশল বা কর্মদর্শন গড়ে তোলেন, যা ইতিহাসে সত্যাগ্রহ নামে পরিচিত।

সত্যাগ্রহ আদর্শ: বিশিষ্ট রুশ লেখক লিও টলস্টয়ের Kingdom of God , ব্রিটিশ লেখক জন রাসকিন রচিত Unto This Last, হেনরি ডেভিড থরোর Civil Disobedience, এডুইন আর্নল্ডের The Light of Asia (বুদ্ধের জীবনী)-সহ বিভিন্ন চিন্তাবিদদের রচনা ও নানা ধর্মদর্শন থেকে গান্ধিজি তাঁর সত্যাগ্রহ আদর্শ রূপায়ণের প্রেরণা পেয়েছিলেন।

ধারণা: মহাত্মা গান্ধির দৃষ্টিতে সত্য হল ইতিবাচক গুণসম্পন্ন এমন একটি শক্তি যা নেতিবাচক উপাদানের বিপরীতে অবস্থান করে। তাঁর কাছে সত্য হল আত্মশক্তি, নির্ভীকতা, নিঃস্বার্থপরতা, সম্প্রীতি, ভালোবাসা ইত্যাদির প্রতীক। অন্যদিকে অসত্য হল পাশবিকতা, ঘৃণা, বিদ্বেষ, স্বার্থপরতা ও পরাধীনতার প্রতীক। নানা পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্য দিয়ে গান্ধিজি এই সত্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন সত্য দিয়ে তিনি অসত্য-কে জয় করতে চেয়েছেন। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, গান্ধিজির কাছে অহিংসার ধারণা বহুক্ষেত্রেই সত্য ধারণার সমার্থক বা পরিপূরক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সহজ ভাষায় বললে, অহিংস উপায়ে আত্মকষ্টের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে জয় করাই হল সত্যাগ্রহ। মহাত্মা গান্ধির মতে, সত্যের প্রতি যে ব্যক্তির কোনও ঘৃণা বা বিদ্বেষ নেই সেই প্রকৃত সত্যাগ্রহী।

রাজনীতিতে প্রয়োগ: রাজনীতিতে সত্যাগ্রহ আদর্শের প্রয়োগ তথা সাফল্যের বিষয়টি বেশ কঠিন বলে গান্ধিজি মনে করতেন। এই সত্যাগ্রহের প্রয়োগ সম্পর্কিত তিনি কয়েকটি বিষয়ের উল্লেখ করেন-

গান্ধিজির মতে, সত্যাগ্রহ হল আত্মার শক্তি বা প্রেমের শক্তি। এর উৎস হল সত্য ও অহিংসা। তিনি বলতেন, অহিংসা কাপুরুষের ভূষণ নয়; অহিংসা বীরত্বের মহান প্রকাশ।

গান্ধিজি বলেছেন, প্রেমের দ্বারা ঘৃণাকে, সত্যের দ্বারা অসত্যকে এবং নির্যাতন ভোগের দ্বারা হিংসাকে জয় করাই হল প্রত্যেক সত্যাগ্রহীর আদর্শ।

f) চৌরিচৌরা হত্যাকান্ড কী? Or, অসহযোগ আন্দোলন কেন প্রত্যাহার করা হয়? অথবা, গান্ধিজি কেন অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেন?

Answere:-  মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে অহিংস আদর্শের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত প্রথম গণ আন্দোলন ছিল অসহযোগ আন্দোলন। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে গান্ধিজি এই আন্দোলন প্রত্যাহার করেন।

● চৌরিচৌরার ঘটনা:-

অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন  ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ৫ ই ফেব্রুয়ারি উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরাতে এক হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে । পুলিশ সত্যাগ্রহী নেতা ভগবান আহীরকে গ্রেফতার করলে স্বেচ্ছাসেবীরা থানা ঘেরাও করেন। পুলিশ অকস্মাৎ জনতার উপর গুলি চালায়। ক্ষিপ্ত জনতা থানায় অগ্নিসংযোগ করলে ২২ জন পুলিশের মৃত্যু হয়। এটিই চৌরিচৌরার ঘটনা নামে পরিচিত। জনতার হিংসাত্মক আচরণে মর্মাহত হয়ে গান্ধিজি অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন। বারদৌলিতে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভায় (১২ ফেব্রুয়ারি) গান্ধিজির সিদ্ধান্ত অনুমোদিতও হয়।

আন্দোলন প্রত্যাহার বিষয়ে গান্ধিজির মুক্তি:

অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের পিছনে মহাত্মা গান্ধির নিজস্ব কিছু যুক্তি ছিল। সেগুলি হল-

(i) হিংসার প্রবেশ: গান্ধিজির আন্দোলনের নীতি ছিল অহিংস। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে বেশকিছু স্থানে সেই নীতি মেনে চলা হয়নি। গান্ধিজির ভাষায়, ‘তখন যদি একে বন্ধ না করা হত তাহলে অহিংস আন্দোলন পরিচালনা করতে গিয়ে আমরা হিংসাত্মক আন্দোলনেরই দায়িত্ব নিয়ে ফেলতাম।’

(ii) জনগণের ধৈর্যচ্যুতি : আন্দোলনের ফলে স্কুলকলেজ বন্ধ থাকায় অভিভাবকরা ক্ষুব্ধ হচ্ছিলেন। সরকারি চাকুরি ও অন্যান্য পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও অধৈর্য হয়ে পড়েছিলেন।

(iii) দেশীয় প্রতিষ্ঠান ও বস্ত্রের জনপ্রিয়তা হ্রাস:

অসহযোগ আন্দোলনের ফলে গড়ে ওঠা জাতীয় বিদ্যালয় ও দেশীয় কাপড়ের জনপ্রিয়তা কমে আসছিল।

এইসব কারণের পরিপ্রেক্ষিতে গান্ধিজি অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেন। এরপর ১০ মার্চ ব্রিটিশ সরকার গান্ধিজিকে কারারুদ্ধ করে।

g) তেহজিব - অল - আখলাক কী?

Answer:- স্যার সৈয়দ আহমেদ খান তাঁর সংস্কারমুখী চিন্তাভাবনা মুসলমান সমাজের মধ্যে সহজে ও দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে তহজিব-অল-আখলাখ নামে একটি উর্দু পত্রিকা প্রকাশ করেন। তহজিব-অল-আখলাখ শব্দের অর্থ হল চরিত্রের পরিশুদ্ধি। উর্দু ভাষায় লেখা ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে একাধিক প্রবন্ধ তহজিব-অল-আখলাখ পত্রিকায় প্রকাশ করে সাধারণ মুসলিমদের হৃদয় পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা চালানো হয়।

● তহজিব অল-আখলাখ পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্যসমূহ:

(i) সমাজসংস্কার: তহজিব-অল-আখলাখ পত্রিকার মাধ্যমে ভারতের মুসলিম সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা হয়। এটি মুসলিমদের রক্ষণশীল মানসিকতা বর্জন করে প্রগতিশীল ও আধুনিক জীবনধারা গড়ে তোলার জন্য প্রচার চালায়।

(ii) শিক্ষার প্রসার: বর্তমান কালের চাহিদা অনুসারে আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করার বিষয়টি তুলে ধরা হয় তহজিব-অল-আখলাখ পত্রিকায়। এতে মুসলিম মনীষীদের রচনা, ইসলামীয় ইতিহাস, বিজ্ঞান ও দর্শন এসব বিষয়ে আলোচনা করা হত।

(iii) নৈতিকতা ও শিষ্টাচার: তহজিব-অল-আখলাখ পত্রিকায় নৈতিকতা, সৎ আচরণ, এবং সুশিক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়। তাছাড়া মুসলমানদের উন্নত অভ্যাস ও আচরণ গ্রহণে উৎসাহিত করাও ছিল এই পত্রিকার অন্যতম উদ্দেশ্য।

(iv) ধর্মীয় সংস্কার: ধর্ম সম্পর্কে সৈয়দ আহমেদ খান তাঁর ভাবনা ব্যাখ্যা করেন এই পত্রিকায়। প্রকৃত ঐস্লামিক ধর্মতত্ত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আধুনিক যুক্তিবাদের ভিত্তিতে সাধারণ মুসলমানদের মন থেকে ধর্ম বিষয়ক ভ্রান্ত ধারণা তথা বিশ্বাস দূর করা ছিল তহজিব-অল-আখলাখ পত্রিকা প্রকাশের অপর উদ্দেশ্য।

১৮৮১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তহজিব-অল-আখলাধ পত্রিকায় প্রকাশিত অসংখ্য প্রবন্ধ মুসলমান সমাজের চিন্তাচেতনার পরিবর্তনের কাজে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের পর এই পত্রিকা আলিগড় ইনস্টিটিউট গেজেট পত্রিকার সঙ্গে মিশে যায়।

h) গান্ধিজি কীভাবে আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা করেন? অথবা, গান্ধিজি কবে, কেন ডান্ডি অভিযান করেন?

Ans: ডান্ডি অভিযান:

অসহযোগ আন্দোলনের পর আইন অমান্য আন্দোলন ছিল গান্ধিজির নেতৃত্বে পরিচালিত দ্বিতীয় সর্বভারতীয় সত্যাগ্রহ আন্দোলন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ‘পূর্ণ স্বরাজ প্রস্তাব’ পাস, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য লবন এবং অন্যান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে গান্ধিজি আইন অমান্য আন্দোলনের ডাক দেন। এই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছিল লবণ সত্যাগ্রহ ও ডান্ডি অভিযান।

উদ্দেশ্য: ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দা, সাইমন কমিশনের প্রতিক্রিয়াশীল নীতি, সশস্ত্র বিপ্লবী কার্যকলাপ-সহ নানান ঘটনা সমগ্র ভারতব্যাপী এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। বড়োলাট লর্ড আরউইনের কাছে গান্ধিজি রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, লবণ কর বিলোপ, করের বোঝা হ্রাস-সহ ১১ দফা প্রস্তাব এই রাখলেও সরকার তা অগ্রাহ্য করে। এই পরিস্থিতিতে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি গুজরাটের সবরমতী আশ্রমে আয়োজিত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে আইন অমান্য আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর গান্ধিজি ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকায় আইন অমান্যর চূড়ান্ত রূপরেখা ঘোষণা করেন। লর্ড আরউইনকে লেখা একটা বড়ো চিঠিতে গান্ধিজি লেখেন (২ মার্চ) যে, গুজরাটের সমুদ্র উপকূলবর্তী ডান্ডি নামক স্থানে তিনি লবণ আইন ভঙ্গ করে আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা করবেন।

যাত্রাপথ:

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১২ মার্চ লবণ আইন অমান্যের জন্য ৭৮ জন অনুগামী-সহ গান্ধিজি সবরমতী আশ্রম থেকে গুজরাটের সমুদ্র উপকূলবর্তী ডান্ডি অভিমুখে যাত্রা করেন। এই পদযাত্রা ইতিহাসে ডান্ডি অভিযান (Dandi March) নামে খ্যাত। প্রায় দুশো মাইলেরও বেশি দীর্ঘ এই যাত্রাপথে হাজার হাজার নারী-পুরুষ গান্ধিজি ও তাঁর সহগামীদের সংবর্ধনা ও অভিনন্দন জানান।  জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম নেত্রী সরোজিনী নাইডু ও অন্যান্যরা তাঁর সহযাত্রী হন। 

লবণ আইন ভঙ্গ:

মাত্র ২৪ দিনে ২৪১ মাইল পথ অতিক্রম করে ৫ এপ্রিল মহাত্মা গান্ধি ডান্ডির সমুদ্রতীরে পৌঁছান। ৬ এপ্রিল নিজ হাতে সমুদ্রের জল থেকে লবণ তৈরি করে লবণ আইন ভঙ্গ করেন। এরপর গান্ধিজির নেতৃত্বে অন্যান্য সত্যাগ্রহীরাও লবণ প্রস্তুত দ্বারা আইন ভঙ্গ করেন। এইভাবে আইন অমান্য আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে।

গুরুত্ব: গান্ধিজির নেতৃত্বে ডান্ডি অভিযানে সাধারণ মানুষ সত্যাগ্রহীদের বিপুল উৎসাহ প্রদান করেছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসু-র মতে, ডান্ডি অভিযান ছিল একটি মহান আন্দোলনের মহান সূচনা। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন যে, ডান্ডি অভিযান পরিকল্পনা ছিল একটি মহান পরিকল্পনা এবং এটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কার্যকর করা হয়েছিল। তাই ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে ডান্ডি অভিযান-এর গুরুত্ব অপরিসীম।

i) ভারতের সংবিধানে ধর্মনিরেপেক্ষতা ও যুক্তরাষ্ট্র বলতে কী বোঝ?

● ধর্মনিরপেক্ষতা:- 

ভারতবর্ষ একটি বহু ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির দেশ। ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় ধর্মনিরপেক্ষ বা Secular শব্দের উল্লেখ রয়েছে। ল্যাটিন শব্দ Saeculum থেকে ইংরেজি Secular শব্দটি এসেছে।১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ৪২ তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রস্তাবনায় ধর্মনিরপেক্ষ বা Secular শব্দটি সংযোজিত হয়েছে।

ধর্মনিরপেক্ষতা (Secularism) বলতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সব ধর্মের প্রতি সমান আচরণ বোঝায়। রাষ্ট্র কোনও ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা দেয় না এবং ব্যক্তিকে নিজের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দেয়।

সংকীর্ণ অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা : সংকীর্ণ অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কহীনতা বা সাধারণ জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র থেকে ধর্মকে পৃথক রাখাকে বোঝায়। ভারতে এমন সংকীর্ণ অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ গ্রহণ করা হয়নি।

ব্যাপক অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা : ব্যাপক অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হল ধর্মের বিষয়ে নিরপেক্ষতা। এখানে বিশেষ কোনও ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্মের মর্যাদা দেওয়া হয় না। এক্ষেত্রে ধর্মীয় বিষয়ে রাষ্ট্রের দিক থেকে কোনও বিশেষ আচরণ কাম্য নয়।

 সংবিধানের ২৫ থেকে ২৮ নং ধারায় প্রকাশিত আদর্শে বলা হয়েছে যে- ভারত রাষ্ট্রের কোনও বিশেষ ধর্ম বা নিজস্ব ধর্ম থাকবে না। রাষ্ট্র কোনও বিশেষ ধর্মের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করবে না, রাষ্ট্রের কাছে সব ধর্মই সমান। রাষ্ট্রের সকল নাগরিক নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করবে এবং রাষ্ট্র সকল ধর্মাবলম্বী মানুষের জন্য সমান সুযোগসুবিধার বিষয়টি সুনিশ্চিত করবে।

● যুক্তরাষ্ট্র:- 

যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো বলতে মূলত বোঝায়, যখন কোনো রাষ্ট্রে একটি কেন্দ্রীয় সরকার ও কতকগুলি আঞ্চলিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতার বণ্টন করা হয়। যেখানে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার কিছু অংশ আঞ্চলিক এলাকাগুলিতে ন্যস্ত থাকে এবং অন্যান্য অংশ কেন্দ্রীয় এলাকাগুলিতে ন্যস্ত থাকে, তখন সেই শাসনব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্র বলে।  28টি অঙ্গরাজ্যের সমন্বয়ে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠিত। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য অনুসারে এখানে কেন্দ্রীয় ও রাজ্যসরকারগুলির মধ্যে ক্ষমতা বণ্টিত হয়েছে। 

2. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও :- (Marks-4)

a) আলিগড় আন্দোলনে সৈয়দ আহমেদ খানের অবদান লেখ।

Answer:- ঔপনিবেশিক শাসনকালে ভারতীয় মুসলিমসমাজের সংস্কার ও অগ্রগতির কাজে যিনি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি হলেন স্যার সৈয়দ আহমদ খান । ড. শচীন সেন তাঁর গ্রন্থে বলেছেন যে, "ব্রিটিশ শাসনকালে স্যার সৈয়দ আহমদের মতো মুসলিম সম্প্রদায়ের এমন হিতাকাঙ্ক্ষী ও মহান নেতা সম্ভবত আর কেউ ছিলেন না।"

1 পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতি সমর্থন:- 

স্যার সৈয়দ আহমদ খান পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসারে আরবি, ফারসি, উর্দু ভাষা ও ইসলামীয় শাস্ত্রে জ্ঞান অর্জন করেন ও পরে ইংরেজি ভাষায়ও দক্ষতা লাভ করেন। প্রথম জীবনে ইংরেজ সরকারের বিচারবিভাগে চাকরি করেন। তখন তিনি বোঝেন যে, ভারতের হিন্দু সম্প্রদায় ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদের সামাজিক অবস্থার উন্নতি করলেও এই শিক্ষা থেকে দূরে থাকায় মুসলিমসমাজ ক্রমে পিছিয়ে পড়েছে। 

2 ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য:-

মুসলিম সম্প্রদায়ের উন্নতি ঘটানোর উদ্দেশ্যে সৈয়দ আহমদ ইংরেজ সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তিনি মুসলিমদের পরামর্শ দেন যে, ইংরেজদের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমেই মুসলিমসমাজের স্বার্থ নিরাপদ ও সুরক্ষিত হবে। তিনি ইংরেজদেরও বোঝাতে সক্ষম হন যে, মুসলিমরা ইংরেজদের বিরোধী নয়। 

3 রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি:- 

 স্যার সৈয়দ আহমদ খান প্রথম জীবনে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। তিনি বলতেন যে, "হিন্দু-মুসলিম একই জাতি, একই জননীর দুই সন্তান"। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে। তিনি 'পাইওনিয়ার' পত্রিকায় লেখেন যে, হিন্দু ও মুসলিম দুটি পৃথক জাতি। এদের রাজনৈতিক স্বার্থও পৃথক। তিনি আশঙ্কা করেন যে, ভারতে প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হবে।

4 শিক্ষার প্রসার:-

স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলিম সম্প্রদায়কে যুক্তিনির্ভর ও স্বাধীন চিন্তাভাবনার অধিকারী হওয়ার পরামর্শ দেন। মুসলিমদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটানোর লক্ষ্যে তিনি গাজিপুরে একটি ইংরেজি বিদ্যালয় (১৮৬৩ খ্রি.) প্রতিষ্ঠা করেন। জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার প্রয়োজনীয় ইংরেজি গ্রন্থাবলি উর্দুতে অনুবাদ এবং সেগুলি মুসলিমদের মধ্যে প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে 'সায়েন্টিফিক সোসাইটি' প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে 'তাহজিব-আল্-আফলাখ' নামে একটি উর্দু পত্রিকা প্রকাশ  করেন। তিনি ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে আলিগড়ে 'অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ' প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে এটি 'আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়'-এ (১৯২০ খ্রি.) পরিণত হয়। 

5 নারীমুক্তি:-

স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলিমসমাজে নারীমুক্তি ও নারীশিক্ষার বিস্তারের পক্ষে এবং পর্দাপ্রথা, বহুবিবাহ ও পত্নীকে 'তালাক' দেওয়ার বিরুদ্ধে মতামত ব্যক্ত করেন। মানবিকতা ও যুক্তির আলোকে তিনি ইসলামকে শক্তিশালী করতে সচেষ্ট হন।

6. আলিগড় আন্দোলন:-

 সৈয়দ আহমদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আলিগড় কলেজকে কেন্দ্র করে পরে মুসলিম-সমাজের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা বিবর্তিত হয়। মুসলিমসমাজের এই জাগরণ 'আলিগড় আন্দোলন' নামে পরিচিত। এই আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন চিরাগ আলি, আলতাফ হোসেন আলি , নাজির আহম্মদ, খুদা বক্স প্রমুখ।

উপসংহার:- স্যার সৈয়দ আহমদ খানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আলিগড় আন্দোলনের মাধ্যমে মুসলিমসমাজে আধুনিকতার ঢেউ লাগে। ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন যে, "হিন্দুসমাজের মঙ্গলসাধনের জন্য রাজা রামমোহন যা করেছিলেন, মুসলিমসমাজের মঙ্গলের জন্য স্যার সৈয়দ আহমদও অনুরূপ ভূমিকা পালন করেন।"

b) মহম্মদ আলি জিন্নার চৌদ্দ দফা দাবী আলোচনা করো।

Ans:- মহম্মদ আলি জিন্নার সভাপতিত্বে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে (২৮ মার্চ) দিল্লিতে মুসলিম লিগের অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনে জিন্না ভারতের মুসলিমদের স্বার্থে তাঁর বিখ্যাত 'চোদ্দো দফা দাবি' (Fourteen Points) পেশ করেন।

[1] চোদ্দো দফা দাবিসমূহ: মহম্মদ আলি জিন্নার চোদ্দো দফা দাবিগুলি ছিল-

i. ভারতে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন। ii. প্রদেশগুলিতে স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন। iii. আইন সভাগুলিতে মুসলিমদের যথেষ্ট সংখ্যক প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ দান। iv. মুসলিমদের জন্য কেন্দ্রীয় আইনসভায় ১/৩ অংশ আসন সংরক্ষণ। v. মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। vi. বাংলা, পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রেখে ভারতের প্রদেশগুলির পুনর্গঠন। vii. সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়কে ধর্মীয় স্বাধীনতা দান। viii. কোনো আইনসভার কোনো সম্প্রদায়ের ৩/৪ অংশ সদস্য কোনো বিলের বিরোধিতা করলে তা প্রত্যাহার। ix. প্রাদেশিক আইনসভার অনুমতি ছাড়া সংবিধান পরিবর্তন না করা। x. কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মন্ত্রীসভায় ১/৩ অংশ মুসলিম সদস্য গ্রহণ করা। xi. রাজ্য ও স্থানীয় সংস্থাগুলিতে মুসলিমদের জন্য পদ সংরক্ষণ করা। xii. সিন্ধু প্রদেশকে বোম্বাই প্রদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নতুন প্রদেশ গঠন করা। xiii. বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে সাংবিধানিক সংস্কার প্রবর্তন। xiv. মুসলিম শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ।

 সমালোচনা: জিন্নার চোদ্দো দফা দাবিগুলি ছিল নেহরু রিপোর্টের প্রস্তাবগুলির সম্পূর্ণ বিপরীত ধরনের। চোদ্দো দফা দাবির অধিকাংশই গণতান্ত্রিক আদর্শের পরিপন্থী ছিল। কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায় দাবিগুলি সমর্থন করে এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক উত্তাপ বৃদ্ধি পায়। 

c)   ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কংগ্রেস নরমপন্থী নেতাদের কর্মসূচি আলোচনা করো।

Answer:- প্রতিষ্ঠালাভের পরবর্তী কুড়ি বছর (১৮৮৫-১৯০৫ খ্রি.) জাতীয় কংগ্রেসের আদিপর্ব নামে পরিচিত। এই পর্বের নেতৃবৃন্দ সরকারের বিরুদ্ধে কোনোরূপ গণ আন্দোলন সংগঠিত করার পরিবর্তে 'আবেদন-নিবেদন'-এর মাধ্যমে সরকারের সহানুভূতি অর্জনে আস্থাশীল ছিলেন। এই কারণে প্রথম পর্বের নেতাদের নরমপন্থী (Moderate) নামে অভিহিত করা হয়। কংগ্রেসের আদিপর্বের নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন দাদাভাই নওরোজি, বদরুদ্দিন তায়েবজী, গোপালকৃষ্ণ  গোখলে, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ।

● আবেদন-নিবেদন নীতি: প্রথম পর্বের কংগ্রেস নেতাদের হার সবাই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত ও পাশ্চাত্য মনোভাবাপন্ন। ইংরেজ-জাতির উদারতা ও ন্যায়বোধের ওপর এঁদের গভীর আস্থা ছিল। ধর্ম ও সমাজ-সংস্কারের মতোই রাজনীতির ক্ষেত্রেও নরমপন্থীরা ছিলেন আবেদন নিবেদনে বিশ্বাসী ।

কর্মসূচি :- 

অর্থনৈতিক দাবি: জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম দিককার নেতাগণ ইংরেজদের অর্থনৈতিক শোষণের ভয়াবহ রূপটি তুলে ধরার পাশাপাশি ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল্যায়ন ও সেই সম্পর্কিত দাবিদাওয়ার উপরে গুরুত্ব আরোপ করেছেন।  ভারতের সর্বত্র চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের দাবি জানানো ,  অবাধ বাণিজ্যনীতি রদ করা ও ভারতীয় শিল্পকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা, বিদেশি কাপড়ের উপর শুল্ক বৃদ্ধি করা, ভূমিরাজস্বের হার কমানো ইত্যাদি দাবি তুলে ধরে।

প্রশাসনিক দাবি: জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন অধিবেশনে প্রশাসনের ভারতীয়করণ-এর দাবি উত্থাপন করেন। বস্তুত, কংগ্রেস মনে করত যে-প্রশাসনিক উচ্চপদগুলিতে অ-ভারতীয়দের নিয়োগের দরুন অর্থনৈতিক এবং নৈতিক দুই দিক থেকেই ভারতের ক্ষতি হচ্ছে। আলোচ্য পর্বে তাই জাতীয় কংগ্রেস শাসন বিভাগের উচ্চপদগুলিতে যোগ্য ভারতীয়দের নিয়োগের দাবি তোলে। পাশাপাশি কংগ্রেস আই সি এস (ICS) পরীক্ষার ভারতীয়করণ, ইংল্যান্ড ও ভারতে একই সময়ে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা গ্রহণ, এই পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের বয়স বাড়িয়ে ২৩ বছর করা, স্ট্যাটুটারি সিভিল সার্ভিসের অবসান ইত্যাদি প্রশাসনিক সংস্কারের দাবিপত্রও পেশ করে।

সাংবিধানিক বা শাসনতান্ত্রিক সংস্কার সংক্রান্ত দাবি: কংগ্রেসের প্রধান দাবি ছিল ভারতবাসীর স্বায়ত্তশাসনের অধিকারের বিষয়টি। এই লক্ষ্যে কংগ্রেস নেতারা বিভিন্ন অধিবেশনে বেশকিছু সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাব গ্রহণ করেন। কংগ্রেস দাবি করে যে, নির্বাচনের ভিত্তিতে জনপ্রতিনিধি গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে। আইনসভাকে বাজেট ও দৈনন্দিন প্রশাসন সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার অধিকার দিতে হবে। 

মূল্যায়ন: আদিপর্বে কংগ্রেসের আন্দোলন খুব বেশি সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এক্ষেত্রে সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতাদের উচ্চবর্গীয় আদবকায়দা, জনগণের সঙ্গে সম্পর্কহীনতা, ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অগাধ আস্থা ইত্যাদি বিষয় বিশেষভাবে দায়ী ছিল। তবে প্রথম পর্বের কংগ্রেসের কার্যাবলির মধ্যে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও বলা যায় যে, কংগ্রেস জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় চেতনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। 

d) বাংলার চরমপন্থী আন্দোলনের উদ্ভবের কারন লেখ।

Ans:- উনবিংশ শতকের শেষদিকে জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে নরমপন্থীদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা স্পষ্টরূপ ধারণ করে। এমতাবস্থায়, নরমপন্থার বিকল্প হিসেবে যে বাস্তববাদী ও কার্যকরী প্রতিরোধ আন্দোলনের ধারার বিকাশ ঘটে, তাই সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদ বা চরমপন্থা (Extremism) নামে পরিচিত। আর এই নতুন ধারার অনুগামীরা অভিহিত হন চরমপন্থী (Extremists) নামে। মহারাষ্ট্রে বাল গঙ্গাধর তিলক, বাংলায় বিপিনচন্দ্র পাল ও অরবিন্দ ঘোষ, পাঞ্জাবে লালা লাজপত রায় প্রমুখ নেতার মাধ্যমে ভারতে চরমপন্থী মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়ে। 

● চরমপন্থী রাজনীতি-র উদ্ভবের প্রেক্ষাপট/কারণসমূহ:

1.. নরমপন্থী রাজনীতির দুর্বলতা: জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর প্রথম কুড়ি বছর কংগ্রেসের নেতৃত্ব নরমপন্থী নেতাদের হাতে ন্যস্ত ছিল। নরমপন্থী নেতারা ব্রিটিশ সরকার ও ইংরেজ জাতির উদারতা মানবতা, সংস্কৃতির প্রতি গভীর আস্থাশীল ছিলেন। এমতাবস্থায় কংগ্রেসের একাংশ মনে করেন যে, নরমপন্থা বা আবেদন-নিবেদন নীতি দ্বারা ভারতবাসীর দাবি আদায় করা সম্ভব নয়। নরমপন্থীদের আপস নীতির পরিবর্তে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ এবং গণ আন্দোলন সংগঠিত করে অধিকার প্রতিষ্ঠার ভাবনা চরমপন্থার জন্ম দেয়।

2.কংগ্রেসের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও ক্ষমতা দখলের লড়াই: কেমব্রিজ গোষ্ঠীর ঐতিহাসিকেরা, যেমন- জুডিথ ব্রাউন, অনিল শীল প্রমুখ চরমপন্থার উৎস হিসেবে জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও ক্ষমতা দখলের লড়াইকে চিহ্নিত করেছেন। 

3. ভাবজাগতিক পরিবর্তন: ড. অমলেশ ত্রিপাঠি চরমপন্থার উদ্ভবের প্রেক্ষাপটে ভাবজাগতিক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন। বিশিষ্ট সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ উপন্যাসে (১৮৮২ খ্রি.) ভারতের যুবসমাজকে দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ ও আত্মত্যাগের আদর্শে উদ্‌বুদ্ধ করেছিল। অন্যদিকে স্বামী বিবেকানন্দ দেশমাতৃকার জন্য আত্মত্যাগের মন্ত্রে যুবসমাজকে উজ্জীবিত করে তোলেন। আবার আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী-র মতাদর্শও চরমপন্থা উদ্ভবের অন্যতম প্রেরণা ছিল। 

4. অর্থনৈতিক কারণ: অর্থনৈতিক দিক থেকেও প্রবল শোষণ, ব্রিটিশ সরকারের বৈষম্যমূলক করব্যবস্থা তথা দেশীয় শিল্পের ধ্বংসসাধন, সামরিক খাতে ক্রমাগত ভারতীয় সম্পদের অপচয় ইত্যাদি বিষয়গুলির দরুন ভারতীয়রা আর্থিকভাবে বিপর্যন্ত হতে থাকে, যা চরমপন্থী রাজনীতির উদ্ভবের পটভূমি রচনায় সাহায্য করেছিল।

5. সরকারের উদাসীনতা: ব্রিটিশ সরকারের পরিকল্পিত উদাসীনতা এবং কঠোরতা চরমপন্থী মতাদর্শ বিকাশের পথ প্রশস্ত করে। আইন পরিষদে ভারতীয়দের নিয়োগ, সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বয়স বৃদ্ধি, নির্বাচন প্রথার প্রচলন জাতীয় কংগ্রেসের এসকল দাবির প্রতি সরকারের মনোভাব ছিল আগাগোড়া নেতিবাচক।  এসবেরই পরিণতিতে চরমপন্থার আবির্ভাব ঘটে। 

e) টীকা লেখো: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের সময় হিন্দু-মুসলিম ঐক্য।

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল- হিন্দু-মুসলিম ঐক্য। সব স্তরের হিন্দু-মুসলমান ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই বিদ্রোহে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। 

● ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের সময় হিন্দু মুসলিম ঐক্য:

(i) দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ কে নেতারূপে ঘোষণা : ১৮৫৭খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহে হিন্দু ও মুসলিমরা সব ভেদাভেদ ভুলে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ-কে নেতা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ, বাহাদুর শাহ ছিলেন ঐক্য ও আন্দোলনের প্রতীকস্বরূপ।

(ii) পরষ্পরের ধর্মের প্রতি সহনশীলতা : বিদ্রোহীরা পরস্পরের ধর্মের প্রতি সহনশীলতার নজির স্থাপন করেছিলেন। দিল্লিতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য অটুট রাখার জন্য সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ বিভিন্ন 11 পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। 

(iii) সক্রিয় হিন্দু মুসলিম নেতৃত্ব : আলোচ্য পর্বে নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দু ও মুসলিম নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ঝাঁসিতে লক্ষ্মীবাঈ, বিহারে কুনওয়ার সিং, কানপুরে “নানাসাহেব, তাঁতিয়া তোপি প্রমুখ নেতানেত্রী যেমন নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তেমনই অযোধ্যায় বেগম হজরত মহল, দিল্লিতে বখৎ খান প্রমুখ ছিলেন নেতৃত্বের অগ্রভাগে।

(iv) ব্রিটিশ কর্তাদের আচরণ ও বক্তব্য: ব্রিটিশ কর্তাব্যক্তিদের আচরণ ও বক্তব্য থেকেও হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের গভীরতার বিষয়টি বোঝা যায়। স্যার হেনরি লরেন্স বড়োলাট লর্ড ক্যানিং-রে এসময় লেখেন যে- ‘আমি দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে। অনৈক্যের আশায় তাকিয়ে আছি।’ কিন্তু সেই আশা অপূর্ণই থেকে যায়।

পরিশেষে বলা যায়, ১৮৫৭-র বিদ্রোহে ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় বিদ্রো হিন্দু-মুসলমান সিপাহিরা যেমন একসঙ্গে কাঁদে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেন, তেমনই সাধারণ হিন্ মুসলিম প্রজারাও ভ্রাতৃভাব বজায় রাখেন, তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষিতে ছিল এক উল্লেখযোগ ঘটনা।

f) রাওলাট সত্যাগ্রহ কী?

Ans:- ১৯১৯ সালের কুখ্যাত রাওলাট আইন-এর প্রতিবাদে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত প্রথম সর্বভারতীয় অহিংস গণআন্দোলন হলো 'রাওলাট সত্যাগ্রহ'।এই আইনে বিনা বিচারে যেকোনো ভারতীয়কে বন্দি করার ক্ষমতা ব্রিটিশদের দেওয়া হয়েছিল। ১৯১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে গান্ধীজি এই সত্যাগ্রহের ডাক দেন এবং ৬ এপ্রিল দেশব্যাপী হরতাল ও আন্দোলনের মাধ্যমে এটি শুরু হয়, যা ভারতীয় রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে তরান্বিত করে। 

প্রেক্ষাপট: স্যার সিডনি রাওলাটের সভাপতিত্বে গঠিত কমিটির সুপারিশে 1919 সালে এই আইন পাস হয়, যা 'কালো আইন' নামে পরিচিত ছিল। এই দমনমূলক আইনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ ও অহিংস পদ্ধতিতে গান্ধীজি তীব্র আন্দোলন শুরু করে। গান্ধীজি এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। এটি ছিল গণআন্দোলনের প্রথম পরীক্ষা, যাতে শহুরে ও গ্রামীণ সব স্তরের মানুষ অংশ নেয়।

পরিণতি: আন্দোলনের তীব্রতা বাড়লে দমন-পীড়ন শুরু হয়, যা পরবর্তীতে ১৩ এপ্রিল ১৯১৯-এর মর্মান্তিক জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যা-এর জন্ম দেয়। হিংসাত্মক পরিস্থিতির কারণে গান্ধীজি এই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন, কিন্তু এটিই ছিল পরবর্তীতে অসহযোগ আন্দোলনের ভিত্তি।

g) চম্পারন সত্যাগ্রহ কী?

Ans:- ১৯১৭ সালে বিহারের চম্পারণ জেলায় মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে সংঘটিত ভারতের প্রথম সফল সত্যাগ্রহ আন্দোলন হলো 'চম্পারণ সত্যাগ্রহ'।  স্থানীয় নীলচাষীদের ওপর ইউরোপীয় নীলকরদের অত্যাচার, জোরপূর্বক নীল চাষ (তীনকাঠিয়া প্রথা) এবং অতিরিক্ত কর আদায়ের বিরুদ্ধে এটি ছিল একটি অহিংস প্রতিরোধ আন্দোলন । রাজ কুমার শুক্লার আমন্ত্রণে গান্ধীজি এই আন্দোলন পরিচালনা করেন।

 প্রেক্ষাপট: তীনকাঠিয়া প্রথা অনুযায়ী কৃষকদের তাদের জমির (3/20) অংশে নীল চাষ করতে বাধ্য করা হতো, যা ছিল অত্যন্ত শোষণমূলক।  মহাত্মা গান্ধী, রাজ কুমার শুক্লা, বাবু ব্রজকিশোর প্রসাদ, ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ, অনুগ্র নারায়ণ সিনহা প্রমুখের নেতৃত্বে এই আন্দোলন শুরু হয়।

ফলাফল: ব্রিটিশ সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয় এবং তীনকাঠিয়া প্রথা বাতিল করে কৃষকদের জোরপূর্বক নেওয়া অর্থের ২৫% ফেরত দেয়। এটি ভারতে গান্ধীজির প্রথম অহিংস আন্দোলনের সাফল্য, যা তাকে "মহাত্মা" উপাধিতে ভূষিত করে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।

 h. স্বরাজ্য দলের কর্মসূচি আলোচনা করো।

Answer:- : স্বরাজ্য দল গঠনের পটভূমি/কারণ :

(i) জাতীয় রাজনীতিতে সংকট: বারদৌলিতে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এবং ভাইসরয় লর্ড রিডিং-এর কঠোর দমননীতি তৎকালীন জাতীয় রাজনীতিতে সংকট সৃষ্টি করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের অনেকের মনেই গান্ধিজির কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। তাছাড়া ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে গান্ধিজি গ্রেফতার হওয়ায় জাতীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতেই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, মোতিলাল নেহরু প্রমুখ নেতৃবর্গ নতুনভাবে জাতীয় আন্দোলন পরিচালনা করার চেষ্টা করেন।

(ii) কংগ্রেসের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব: জাতীয় কংগ্রেসের নেতাদের মধ্যে চিত্তরঞ্জন দাশ, মোতিলাল নেহরু প্রমুখ মনে করতেন, Legislative Council তথা আইন বা ব্যবস্থাপক সভায় কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করা উচিত। তাই ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্থির হয় যে, ডিসেম্বর মাসে আসন্ন গয়া অধিবেশনে পরবর্তী নীতি নির্ধারিত হবে। বস্তুত, নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের মধ্যে দুটি গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়- হাকিম আজমল খান, বিঠলভাই প্যাটেল, মদনমোহন মালব্য প্রমুখ পরিবর্তনের সমর্থক নেতারা আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার মতকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে, পরিবর্তন-বিরোধী গোষ্ঠী অর্থাৎ রাজেন্দ্র প্রসাদ, চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী প্রমুখ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আইনসভায় প্রবেশের পক্ষপাতী ছিলেন না।

(iii) কংগ্রেসের গয়া অধিবেশন: কংগ্রেসের গয়া অধিবেশনে (ডিসেম্বর, ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ) সভাপতিত্ব করেন চিত্তরঞ্জন দাশ এবং সম্পাদক হন মোতিলাল নেহরু। কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে গয়ায় ভোটাভুটি হলে পরিবর্তনবিরোধীরা পরাজিত হন  এবং প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। মর্মাহত হয়ে দেশবন্ধু ও মোতিলাল নেহরু নিজ নিজ পদে ইস্তফা দেন।

স্বরাজ্য বা স্বরাজ দল গঠন: এরপর ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি মোতিলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখের সাহায্যে চিত্তরঞ্জন দাশ কংগ্রেসের অভ্যন্তরেই একটি দল গঠন করেন। এই দলের নাম হয় কংগ্রেস খিলাফৎ স্বরাজ পার্টি বা সংক্ষেপে স্বরাজ বা স্বরাজ্য দল। এই নবপ্রতিষ্ঠিত দলের। সভাপতি হন চিত্তরঞ্জন দাশ এবং মোতিলাল নেহরু অন্যতম সম্পাদক পদে বসেন।

● স্বরাজ্য দলের কর্মসূচি:-

স্বরাজ্য দলের কর্মসূচি গুলি হল -

a) অর্থনৈতিক নীতি গ্রহন করে বৈদেশিক শোষন বন্ধ করা।

b) নানা বিল ও প্রস্তাব উথ্বাপন করে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধের বিকাশ ঘটানো।

c ) নির্বাচনের মাধ্যমে আইনসভায় প্রবেশ করে সরকারের কাজে বিরোধিতা করা।

d) সরকারি বাজেট প্রত্যাখ্যান করা। 

I. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের ভূমিকা লেখো।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ভারত মানবিক, নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে এবং নিজের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে/মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা:

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত মানবিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক-সকল দিক থেকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

(i) প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির ভূমিকা: ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের একেবারে শেষের দিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধি সংসদে প্রস্তাব রাখেন যে, ‘ভারতের জনগণ পূর্ব বাংলার পাশে আছে। ওদের (পূর্ব বাংলার মুক্তিযোদ্ধা) আত্মবিসর্জন বৃথা হবে না, ভারতবর্ষের সর্বান্তঃকরণ সহানুভূতি এবং সহায়তা ওরা পাবেন।’ 

(ii) মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণদান: মুক্তিকামী বাংলাদেশের যোদ্ধারা পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালালেও তাদের পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ছিল। এপ্রিল মাস থেকে ভারতের বি এস এফ বাহিনী (Border Security Force) বিক্ষিপ্তভাবে তাঁদের প্রশিক্ষণদান, অস্ত্র সরবরাহ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সাহায্য করছিল।

(iii) শরণার্থীদের আশ্রয়দান: মুক্তিযুদ্ধের পর্বে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীদের আশ্রয়দান ভারত সরকারের সহযোগিতার অপর এক অধ্যায়। পরিসংখ্যান মতে, ৭১-এর মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রত্যেকদিন গড়ে ২০,০০০-৪৫,০০০ ভীত, সন্ত্রস্ত শরণার্থী এদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এদের মধ্যে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান প্রায় সব ধর্মেরই মানুষ ছিলেন। এই বিপুল সংখ্যক (প্রায় ১ কোটি) শরণার্থীর ভার বহনের জন্য ভারতকে ব্যয় করতে হয়েছে ২৬০ কোটি টাকা। শুধু বাস্তুহারাদের আশ্রয়দানই নয়, তাদের খাদ্য, চিকিৎসা, গৃহনির্মাণেও ভারত অকাতরে অর্থ ব্যয় করেছিল।

j) হোমরুল আন্দোলনের গুরুত্ব লেখ।

Ans:- হোম রুল আন্দোলন ছিল ব্রিটিশ পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন। এই আন্দোলন ১৯১৬-১৯১৮ সালের মধ্যে প্রায় দুই বছর স্থায়ী হয়েছিল। অ্যানি বেসান্ত এবং বাল গঙ্গাধর তিলকের নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্দোলন শিক্ষিত ইংরেজিভাষী উচ্চবিত্ত ভারতীয়দের কাছে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের মঞ্চ তৈরি করেছিল।

নেতৃত্ব: বাল গঙ্গাধর তিলক  এবং অ্যানি বেসান্ত (সেপ্টেম্বর ১৯১৬, মাদ্রাজ) দুটি পৃথক লীগ প্রতিষ্ঠা করেন।

উদ্দেশ্য: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ রাজের অধীনে ভারতীয়দের জন্য স্ব-শাসন বা ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস অর্জন করা 

তিলকের ভূমিকা: তিনি 'স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার এবং আমি তা পাব' স্লোগানটি জনপ্রিয় করেন এবং 'মারাঠা' ও 'কেসরি' পত্রিকার মাধ্যমে মতবাদ প্রচার করেন।

বেসান্তের ভূমিকা: তিনি 'নিউ ইন্ডিয়া' ও 'কমনউইল' পত্রিকার মাধ্যমে আন্দোলন পরিচালনা করেন এবং ১৯১৭ সালে গ্রেপ্তার হন, যা আন্দোলনকে আরও তীব্র করে।

প্রভাব: এই আন্দোলনটি ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা বৃদ্ধি করে এবং পরবর্তীকালে মহাত্মা গান্ধীর গণআন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।

অবসান: ১৯২০ সালে 'অল ইন্ডিয়া হোম রুল লীগ' তার নাম পরিবর্তন করে 'স্বরাজ্য সভা' রাখে  এই আন্দোলনটি মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে জনপ্রিয় হলেও, এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন কংগ্রেসের ঝিমিয়ে পড়া রাজনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছিল।

K) মুসলিম লিগের প্রত্যহ্ম সংগ্রাম কী?

Ans:- প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস (Direct Action Day) হলো ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগ কর্তৃক ঘোষিত একটি সাধারণ ধর্মঘট ও বিক্ষোভ দিবস, যার মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের দাবি আদায় করা। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে, কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানের পর পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে এই দিনটি পালন করা হয়। এই দিনটি কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার (গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস) জন্ম দেয়।

প্রেক্ষাপট: ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট এই দিনটি প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস নামে পরিচিত। মুসলিম লীগ মনে করেছিল যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাথে আলোচনার মাধ্যমে তাদের দাবি পূরণ হবে না, তাই তারা এই কঠোর আন্দোলনের ডাক দেয়।

উদ্দেশ্য: ব্রিটিশ ও কংগ্রেসকে চাপে ফেলে মুসলমানদের জন্য একটি আলাদা দেশ বা রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা 

ভয়াবহ পরিণতি: এই দিনের ধর্মঘট কেন্দ্র করে কলকাতায় ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয়, যা কয়েকদিন ধরে চলে।  এতে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।

রাজনৈতিক প্রভাব: এই ঘটনা ভারতে সাম্প্রদায়িক বিভাজন চরম পর্যায়ে নিয়ে যায় এবং অবশেষে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনের পথ সুগম করে।

l )  তেভাগা আন্দোলন কী?

Ans:- বাংলার কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে তেভাগা আন্দোলন (১৯৪৬) একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯৩৮ সালে ফ্লাউড কমিশনের রিপোর্টে বাংলার বর্গাদার বা ভাগচাষিকে উৎপন্ন ফসলের তিনভাগের দু'ভাগ দেবার সুপারিশ করা হয়। তাই মালদা, মেদিনীপুর, জলপাইগুড়ি, ময়মনসিং, রংপুর ও দিনাজপুরে বর্গাদার ভাগচাষি কৃষকেরা ১৯৪০ সালের ২ মার্চ "ফ্লাউড কমিশনের” রিপোর্টের ভিত্তিতে উৎপন্ন ফসলের ২/৩ ভাগ দাবি করে জোতদার ও ধনী কৃষকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এটি 'তেভাগা আন্দোলন' নামে পরিচিত। বিদ্রোহীদের স্লোগান ছিল "আধি নয়, তেভাগা চাই”, “লাঙল যার জমি তার", "জমিদারি প্রথা ধ্বংস হোক” ইত্যাদি। 

● ফলাফল:-

 তেভাগা আন্দোলনের ফলাফল বিশ্বেষণ করতে গিয়ে বলা যায়-

(১) ব্যাপক সাড়া: ঐতিহাসিক কুপারের (A. Copper) মতে ১৯৪৬ সালের শেষের দিকে বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।  আন্দোলনে এত বিপুল সাড়া 'প্রাদেশিক কৃষকসভাকে' অবাক করে দিয়েছিল।

 (২) হতাহত:- সুনীল সেন তাঁর 'Peasant Movement in India' গ্রন্থে লিখেছেন এই অন্দোলনে ৪৯ জন শহীদ হন।তেভাগা আন্দোলনের প্রধান শক্তি ছিল বর্গাকার অর্থাৎ দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষক।” তারা কমিউনিস্টদের সাহায্য ঠিকঠাক না পেয়ে ব্যর্থ হয়েছিল।

 (৩) রাজনৈতিক চেতনার প্রসার: গ্রামের কৃষক এই আন্দোলনের দ্বারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়। ছোটো, বড়ো জোতদারদের  মধ্যে পার্থক্য, অন্যান্য গ্রামীণ শ্রেণি বিন্যাস, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অর্থসংকটজনিত সামাজিক পরিবর্তন ইত্যাদি তেভাগা আন্দোলনের মতো আরও অনেক প্রতিরোধ গড়ে ওঠার অনুকূল প্রেক্ষাপট গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।

 (৪) বর্গাদারদের শক্তি বৃদ্ধি: ১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রাদেশিক কৃষক সভার ডাকে তেভাগা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ১৯টি জেলার ভাগচাষি বা বর্গাদারদের পক্ষে। প্রায় ৬০ লক্ষ কৃষক ও কৃষক রমণীর অংশ গ্রহণে এই আন্দোলনে ছড়িয়ে পড়েছিল।

(৫) বর্গাদার বিল পাশ :- তেভাগা আন্দোলনের ফলে বর্গাদার বিল পাশ হয়। ১৯৪৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বর্গাদার বিল পাশ করে ভাগচাষীদের দাবিকে স্বীকৃতি দেয়।

M)ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে গান্ধীজির ভূমিকা লেখ। 

 ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮) সত্য ও অহিংসার (সত্যাগ্রহ) পথে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই পরিচালনা করেন। ১৯১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফেরার পর চম্পারণ ও খেদা সত্যাগ্রহের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে এবং অসহযোগ, আইন অমান্য ও ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা এনে দেন।

সত্যাগ্রহ ও অহিংসা: গান্ধীজি ভারতে প্রথম চম্পারণ সত্যাগ্রহ (১৯১৭) পরিচালনা করেন। গান্ধীজি সত্য ও অহিংসার (আহিংসা) ওপর ভিত্তি করে 'সত্যাগ্রহ' নামের একটি নতুন প্রতিবাদ পদ্ধতি প্রবর্তন করেন।  এটি ব্রিটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধের পথ দেখায়।

গন আন্দোলন: তিনি অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-২২), আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০) এবং ডান্ডি মার্চ, এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২) এর মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যান। 

:চম্পারণ ও খেদা সত্যাগ্রহ (১৯১৭-১৮): ভারতে কৃষকদের অধিকার রক্ষায় প্রথম সফল আন্দোলন। 

অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-২২): ব্রিটিশ পণ্য, স্কুল ও আদালত বর্জনের ডাক দিয়ে অসহযোগিতা শুরু করেন।

আইন অমান্য আন্দোলন ও ডান্ডি মার্চ (১৯৩০): লবণের ওপর ব্রিটিশ একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙতে তিনি ২৪০ মাইল হেঁটে ডান্ডি যাত্রা করেন, যা বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলে। 

ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২): ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ও ব্যাপক গণআন্দোলন শুরু করেন।

● জেনে রাখো ●

1. বঙ্গবন্ধুর ছয়দফা দাবি (১৯৬৬) গুলি হল-

(i) প্রশাসনিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতিপ্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর প্রথম প্রস্তাব ছিল লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সাংবিধান রচনা করে পাকিস্তানকে একটি ফেডারেশনে পরিণত করা।

(ii) মুদ্রা বা অর্থ সংক্রান্ত ক্ষমতা প্রসঙ্গে প্রস্তাবে বলা হয় সমগ্র দেশের জন্য দুটি পৃথক অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালু করতে হবে। 

(iii) কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা প্রসঙ্গে প্রস্তাব দেওয়া হয়, কেন্দ্রীয় ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের ক্ষমতা শুধু দেশরক্ষা ও বিদেশনীতির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে । 

(iv) রাজস্ব, কর বা শুল্ক বিষয়ক ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়, কর বা শুল্ক ধার্য করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলির সার্বভৌম ক্ষমতা দিতে হবে। 

(v) বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা প্রসঙ্গে প্রস্তাব দেওয়া হয়, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত প্রতিটি রাজ্যের বহির্বাণিজ্যের পৃথক হিসাব রাখতে হবে ।

(vi) আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা বিষয়ে দাবি করা হয়, আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য সংবিধানে অঙ্গরাজ্যগুলিকে নিজ কর্তৃত্বে আধা-সামরিক বা আঞ্চলিক সেনা সংগঠন ও রাখার ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।

১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লিগের "কার্যনির্বাহী কমিটির সভায়” শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দিন আহমেদের ভূমিকা সম্বলিত এই "ছয় দফা দাবির" লক্ষ্য প্রসঙ্গে এক পুস্তিকাতে বলা হয়- "এই ছয় দফা দাবি আমাদের বাঁচার দাবি।"  আর এই ছয় দফার দাবিতে আন্দোলনকে "বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ" বা "ম্যাগনা কাটা" বলা হয়।

2. সিপাহী বিদ্রোহ কে Telegraph war বলা হয় কেন ?

1857 খ্রি: সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হয় । এই বিদ্রোহের ব্যর্থতার একটি অন্যতম কারন হল উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা । বিদ্রোহীদের পিছনে ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও একটি বিষয়ে তারা পিছিয়ে ছিল; তা হল আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। কারণ তারা সরকারি রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগাতে পারেনি। অন্যদিকে ইংরেজদের হাতে ছিল রেল পরিসেবা। তারা রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সৈন্য পাঠায়। এ ছাড়া টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার সাহায্য নিয়ে ইংরেজ প্রশাসন দ্রুত এই বিদ্রোহ দমন করতে সম্ভবপর হয়। সেজন্য সিপাহি বিদ্রোহকে 'Telegraph war' বলা হয়।

● রেলপথ ও  টেলিগ্রাফের বিস্তার :- ডালহৌসীর আমলে ভারতে রেলপথ ও টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় ব্রিটিশদের পক্ষে সামরিক আদান-প্রদান ও এক স্থান থেকে অন্যস্থানে সৈন্য প্রেরণ সহজ হয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় সিপাহিদের পক্ষে সেই ধরনের কোন যোগাযোগ গড়ে না ওঠায় তাদের বিভিন্ন সময় বেকায়দায় পড়তে হয়। ভারতীয় সিপাহিরা বিভিন্ন স্থানের মধ্যে গোপন যোগাযাগ রক্ষার ক্ষেত্রেও ব্যর্থ হয়েছিল।

3. আলিগড় আন্দোলনে অধ্যক্ষ থিওডোর বেক-এর প্রভাব কেমন লেখ ?

আলিগড় কলেজের অধ্যক্ষ থিওডোর বেক-এর প্রভাবে স্যার সৈয়দ আহমদ জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। অধ্যক্ষ বেক তাঁকে বোঝান যে, ইংরেজ সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখালে সব দিক থেকেই মুসলিম সমাজের উন্নতি হবে, আর এজন্যই তিনি কংগ্রেস ও হিন্দু বিরোধিতার নীতি গ্রহণ করেন। অন্যদিকে ড. ডেভিড লেলিভেল্ড বলেন যে, "সৈয়দ আহমদ রূপী ওথেলোর ক্ষেত্রে থিওডোর বেক ইয়াগোর ভূমিকা নেন।"-তবে এ বক্তব্য সঠিক নয়। তিনি বলেন যে, অধ্যক্ষ বেকের ভারতে আসার অনেক আগেই স্যার সৈয়দ আহমদের মধ্যে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও কংগ্রেস বিরোধিতা দেখা দেয়। অধ্যক্ষ বেকের সংস্পর্শে এসে তা আরও জোরদার হয়েছিল মাত্র। সৈয়দ আহমদ ও তাঁর মতো অভিজাতরা মোগল যুগের অভিজাত রক্তের জন্য গর্বিত ছিলেন। মুসলিম 'কুয়াম' বলতে তাঁরা অভিজাতদের কথাই ভাবতেন এবং মনে করতেন যে, ভারতের শাসনব্যবস্থায় একমাত্র তাঁদেরই উচ্চপদ পাওয়ার অধিকার আছে। অন্যদিকে, জাতীয় কংগ্রেসের দাবি ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। তবে কংগ্রেসের দাবি বাস্তবায়িত হলে মুসলিম অভিজাতরা তাদের অধিকার হারাতেন। এজন্যই ছিল তাঁর কংগ্রেস-বিরোধিতা। 

4. রাজাজি সূত্র বা ফর্মুলা (C R FORMULA ) কী ? 

১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ মে কারারুদ্ধ গান্ধিজির জেলমুক্তির কিছু আগে তাঁর সম্মতি নিয়ে মাদ্রাজের চাণক্য চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে একটি সমাধান সূত্র তৈরি করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম লিগের জিন্নাকে 'পৃথক পাকিস্তান' গঠনের দাবি থেকে বিচ্যুত করে আসন্ন ভারত ভাগের পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করা। জিন্নাকে কিছু সুযোগ দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন থেকে তাঁকে নিরস্ত্র করাই ছিল রাজাজির উদ্দেশ্যে।

তিনি জিন্নার সঙ্গে কিছু আলাপ-আলোচনার পর তাঁর 'সমাধান সূত্রে' যেসব প্রস্তাব তুলে ধরেন তার মধ্যে অন্যতম হল- (১) মুসলিম লিগকে জাতীয় কংগ্রেসের স্বাধীনতার দাবিকে পূর্ণ সমর্থন করতে হবে। (২) পরিবর্তনের যুগে অন্তর্বর্তীকালীন প্রভিশন্যাল গভর্নমেন্ট গঠনের ক্ষেত্রে মুসলিম লিগকে কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। (৩) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় গণতন্ত্রকে বলবৎ করার উদ্যোগ নিতে হবে। (৪) এইসব মুসলিম অধ্যুষিত স্থানের মানুষ হিন্দুস্থান থাকতে চায়, না চায় না-তা গণভোটের দ্বারা ঠিক করতে হবে। যদি তারা বিচ্ছিন্ন হতে চায় তবে নিরাপত্তা, যোগাযোগ ইত্যাদি বিষয়ে চুক্তি করতে হবে। (৫) গণভোটের আগে সমস্ত দলকে তাদের মতামত মুসলিম লিগ অধিকৃত স্থানে প্রচারের সুযোগ দিতে হবে। (৬) পৃথক রাষ্ট্রগঠনের পক্ষে অধিকাংশ মানুষের সমর্থন থাকলে অবশ্যই পারস্পরিক স্বার্থে ও সুবিধার্থে তা কার্যকর হবে। তবে সরকার পূর্ণ স্বাধীনতা না দিলে এই উদ্যোগ গ্রাহ্য হবে না।

5. বান্দুং সম্মেলন: ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ থেকে ২৬ এপ্রিল মাসে এশিয়া ও আফ্রিকার ২৯টি দেশের নেতৃবৃন্দ ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং শহরে আয়োজিত এক সম্মেলনে মিলিত হয়ে সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। তাঁরা অ্যাফ্রো-এশীয় দেশগুলি থেকে সাম্রাজ্য শোষকদের সরে যেতে জোরদার দাবি তোলে। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু বান্দুং সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই সম্মেলনে তাঁর "পঞ্চশীল নীতি” আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। এই বান্দুং সম্মেলনের আদর্শের ভিত্তিতে 'জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন' গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনের মূল রূপকার হলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। যাঁকে সৃজনশীল রাজনীতির রূপকার হিসাবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টোন চার্চিল "এশিয়ার আলো" ("Light of Asia") বলেছেন। এই সম্মেলনের পর জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন আন্তর্জাতিক আন্দোলনে পরিণত হয়। এই সময় থেকে ভারত বোঝাবার চেষ্টা করেছে যে, বিভিন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে যেসব চুক্তি করেছে, যথা-'ভারত-রুশ চুক্তি', 'তাসখন্দ চুক্তি' ও 'সিমলা চুক্তি' তার প্রকৃত উদ্দেশ্য হল-পারস্পরিক সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি বজায় রাখা।

6. পঞ্চশীল নীতি: বান্দুং সম্মেলনে পণ্ডিত নেহরু ভারতে জোটনিরপেক্ষ বিদেশ নীতির আদর্শ তুলে ধরতে গিয়ে। "পঞ্চশীলের" কথা বলেন। তাঁর মতে পঞ্চশীল হল পাঁচটি মহান আদর্শ- (১) প্রতিটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। (২) অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা। (৩) পারস্পরিক মান্য ও সহযোগিতা বজায় রাখা। (৪) পারস্পরিক অনাক্রমণ নীতি মেনে চলা। (৫) শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নীতি গ্রহণ করা। বান্দুং সম্মেলনে ঘোষিত এই পঞ্চশীল নীতিকে স্বীকৃত জানিয়েছিলেন চিনের প্রধানমন্ত্রী চৌ-এন-লাই। 

পঞ্চশীল নীতির প্রতি আস্থাশীল দেশগুলি পরস্পর অঙ্গীকারবদ্ধ যে তারা পরস্পরের সীমা লঙ্ঘন করে আক্রমণ করবে না ও অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপও করবে না।

7. দশশীল নীতি: জওহরলাল নেহরু (ভারতের প্রধানমন্ত্রী), চৌ-এন-লাই (চিনা প্রধানমন্ত্রী), গামাল আবদেল নাসের (মিশরের প্রধানমন্ত্রী) সহ ২৯টি দেশের প্রতিনিধি বান্দুং সম্মেলনে  'পঞ্চশীল নীতি' 'দশশীল নীতিতে' রূপান্তরিত করে।

এই দশটি নীতি হল-(১) প্রতিটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে স্বীকৃতি দান, (২) জাতিপুঞ্জের উদ্দেশ্য ও মানবাধিকারকে সম্মান প্রদর্শন, (৩) কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে না-হস্তক্ষেপ নীতি কার্যকর করা, (৪) সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সনদে যে আত্মনিয়ন্ত্রণের কথা বলা আছে তার প্রতি আস্থা প্রদর্শন, (৫) ছোটো, বড়ো সব জাত ও বর্ণের সমানাধিকার প্রদান, (৬) কোনো রাষ্ট্রের প্রতি ভীতি প্রদর্শন, বল প্রয়োগ বা আক্রমণ না করা, (৭) কোনো বৃহত্তর সামরিক শক্তির স্বার্থে অন্য দেশের উপর চাপ সৃষ্টিতে মদত না দেওয়া, (৮) পারস্পরিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতা ও স্বার্থরক্ষার ব্যবস্থা করা। (৯) মানবতা, মূল্যবোধ ও ন্যায়নীতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে আন্তর্জাতিকতাবোধ ও বিশ্বভ্রাতৃত্ব বোধ বৃদ্ধি করা এবং (১০) পারস্পরিক আপস, আলোচনা, সালিশি ও শান্তিপূর্ণ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কোনো বিরোধ বা মনোমালিন্যের অবসান ঘটানো।

8. ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনা: 

ভারতের সংবিধানের মূল নীতি ও আদর্শ সংবিধানের প্রস্তাবনার মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। তাই এই সংবিধানের প্রস্তাবনাকে সংবিধানের দর্পণ বলা হয়। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রস্তাবনার (১৭৮৭) অনুকরণে বর্তমান পৃথিবীর প্রায় সবদেশের লিখিত সংবিধানে প্রস্তাবনা সংযোজিত হয়েছে। ভারতের সংবিধানেও আছে একটি প্রস্তাবনা। সংবিধানের মূল নীতিসমূহ, দার্শনিক ভিত্তি, তত্ত্ব, আদর্শ, উদ্দেশ্য ইত্যাদি সবই প্রস্তাবনার মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছে। তাই এই প্রস্তাবনাকে সংবিদানের 'ক্ষুদ্র সংস্করণ' ও 'আত্মজীবনী' বলে কেউ কেউ মনে করেন।'

সংবিধানের প্রস্তাবনার মূল বক্তব্যটি হল এই রকম: "আমরা ভারতের জনগণ” (We, the people of India), একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র (Sovereign Democratic Republic) গঠনের জন্য দৃঢ়সংকল্প নিয়ে ভারতের সব নাগরিকের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক ন্যায়বিচার (Justice); চিন্তার, বাক্যের, বিশ্বাসের, ধর্মের ও উপাসনার স্বাধীনতা (Liberty); সুযোগ ও মর্যাদার সমতা (Equal-ity); সকলের জন্য ভ্রাতৃত্ববোধ (Fraternity) জাগ্রত করে ব্যক্তির মর্যাদা এবং জাতির ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠায় সংকল্পবদ্ধ হয়ে আমাদের গণপরিষদে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ নভেম্বর এই সংবিধান গ্রহণ, রূপায়ণ ও নিজেদের সমর্পণ করছি।

9. 5.1.2 গণপরিষদ বা সংবিধানসভা গঠন:- 

1946 খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার একটি সংবিধানসভা গঠনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। ওই সভার কাজ হবে ভারতের জন্য একটি সংবিধান রচনা করা। প্রধান দুই ভারতীয় রাজনৈতিক পক্ষ জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ 1946 খ্রিস্টাব্দের জুনে ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব মেনে নেয়। ফলে মিশন নির্ধারিত নিয়ম মেনে 1946 খ্রিস্টাব্দের জুলাই-আগস্ট মাসে প্রাদেশিক আইনসভাগুলির প্রতিনিধিদের দ্বারা গণপরিষদের সদস্যগণ নির্বাচিত হন। ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব অনুসারে গণপরিষদের মোট সদস্যসংখ্যা স্থির হয় 389 জন। 

ভারতের গণপরিষদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য:- 

(1) সংবিধান রচনা: ভারতের গণপরিষদের মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীন ভারতের জন্য একটি লিখিত সংবিধান তৈরি করা। এই সংবিধান দেশ পরিচালনার মূল ভিত্তি হবে ও নাগরিকদের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করবে।

(2) গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: ভারতের গণপরিষদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে ভারতের জনগণ সরাসরি বা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশ শাসন করতে পারবে। 

(3) মৌলিক অধিকার: দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত করা। এই অধিকারগুলি সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হবে এবং কোনো আইনের দ্বারা লঙ্ঘন করা যাবে না।

(4) যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো: কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে ক্ষমতার সুষম বণ্টন করে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ব্যবস্থা করা।

(5) সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: ভারতে জাতি, ধর্ম, ভাষা এবং সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের মধ্যে সম্প্রীতি ও ঐক্য বজায় রাখা গণপরিষদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থান ও সমানাধিকার নিশ্চিত করা।

10. ওয়াভেল পরিকল্পনা :-

ইউরোপে জার্মানির পতনের (এপ্রিল, ১৯৪৫) পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির মুখে আসেন। জাপানের বিরুদ্ধে তখনও যুদ্ধ চলছে। ভারতবর্ষে অর্থনৈতিক সমস্যা এবং হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক প্রশ্নে উদ্ভূত রাজনৈতিক অচলাবস্থা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ভারতের সামরিক গুরুত্বের কথা ভেবে ওয়াভেল ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুন কতকগুলি সুপারিশ সংবলিত একটি খসড়াপত্র কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের কাছে পেশ করেন। এটাই 'ওয়াভেল পরিকল্পনা' (Wavell Plan) নামে পরিচিত ছিল।

▶শর্তাবলি: ওয়াভেল তাঁর পরিকল্পনাতে উল্লেখ করেন-(১) সরকার দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর এবং ভারতীয়দের জন্য সংবিধান রচনার কাজ শুরু করবে। (২) বড়োলাটের কার্যনির্বাহক সমিতিতে বর্ণহিন্দু ও মুসলমানের অনুপাত হবে সমান। (৩) কার্যনির্বাহক সমিতিতে একমাত্র বড়োলাট ও প্রধান সেনাপতি ছাড়া সমস্ত সদস্য ভারতীদের থেকে নিযুক্ত হবেন। (৪) যতদিন ভারতের প্রতিরক্ষা ব্রিটিশদের হাতে থাকবে, ততদিন সামরিক দপ্তর সরকারের অধীনে থাকবে এবং (৫) ভারতীয়দের দ্বারা নতুন সংবিধান রচিত না হওয়া পর্যন্ত ভারতীয় প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হবে। 

11. অর্থনৈতিক উদারীকরণ বলতে কী বোঝো ? এর বৈশিষ্ট্যগুলি সম্পর্কে আলোচনা করো।

Ans: অর্থনৈতিক উদারীকরণের ধারণা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ঠান্ডা বৃদ্ধের আবহাওয়া সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রচলিত হয়েছিল। মর্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে। হারই ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। বিশ্ব অর্থব্যবস্থার সঙ্গে সংগতি রেখে দেশগুলি নিজেদের অর্থনীতিকে পরিচালিত করতে সচেষ্ট হয়। এই নতুন ব্যবস্থা অর্থনৈতিক উদারীকরণ (Economic Liberalisation) নামে পরিচিত। বস্তুত, এটি হল অবাধ, উন্মুক্ত ও জটিলতাহীন একধরনের গতিশীল অর্থনৈতিক কর্মসূচি।ফাইন্যান্সিয়াল সফ্টওয়্যার

ভারতের অর্থনৈতিক উদারীকরণ নীতি গ্রহণ: ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে প্রবল অর্থনৈতিক সংকট নিয়ন্ত্রণের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. পি ভি নরসিমহা রাও-এর নেতৃত্বে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ভারতে অর্থনৈতিক উদারীকরণ নীতি গ্রহণ করেন।

নতুন এই আর্থিক নীতির মাধ্যমে ভারত সরকার নীতিগতভাবে সংরক্ষণমুক্ত অবাধ বাণিজ্যনীতি, বৈদেশিক মূলধন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উদারনীতি গ্রহণ করে বিশ্বায়নের ধারণাকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রয়োগের পথ খুলে দেয়। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ইত্যাদি অর্থব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রকে এই উদার অর্থনীতি বা উদারীকরণের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

অর্থনৈতিক উদারীকরণের বৈশিষ্ট্য: উদার অর্থনীতি হল মূলত বাজারের শক্তির (চাহিদা + জোগান) উপর নির্ভরশীল একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। উদারীকরণের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল-

আমদানি- রফতানির উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা। এজন্য শুল্ক সংরক্ষণ নীতি বর্জন করে বাণিজ্যিক লেনদেন অবাধ করে দেওয়া হয়।

শিল্পবাণিজ্যে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সীমা বাতিল করা হয়। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার বা তৃতীয় পক্ষের শর্ত আরোপ নিষিদ্ধ হয়।

রাষ্ট্র পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত শিল্পবাণিজ্যের ক্ষেত্রগুলিকে বেসরকারি করার উপর জোর দেওয়া হয়।

12. ভারতীয় সংবিধানে কীভাবে নারী অধিকার বিষয়টি সুরক্ষিত করা হয়েছে?

Ans: ভারতীয় সংবিধানে নারী অধিকার: নারী অধিকার বলতে বোঝায় সকল বয়সের নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য একধরনের স্বাধীনতা। পিতৃতান্ত্রিকতা থেকে ভারতীয় সমাজ তথা নারীদের রক্ষা করার জন্য ভারতীয় সংবিধানে একাধিক ব্যবস্থার বিধান আছে। এক্ষেত্রে পুরুষদের মতো মহিলাদেরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়েছে। এই সকল অধিকারগুলি লিঙ্গবৈষম্য দূর করতে এবং সমাজে নারীদের সুযোগসুবিধা ও মর্যাদা সুনিশ্চিত করতে সাহায্য করে।

সামাজিক ক্ষেত্রে অধিকার:

সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে ১২ থেকে ৩৫ নং ধারায় মৌলিক অধিকারসমূহের উল্লেখ রয়েছে।

মহিলাদের বিশেষ স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য রাষ্ট্রকে বিশেষ আইন প্রণয়নের অধিকার দেওয়া হয়েছে।

নারীর সামাজিক মর্যাদা রক্ষা ও ক্ষমতায়নের উপযোগী বিভিন্ন আইনগুলি হল-

(a) বিবাহব্যবস্থা সংক্রান্ত আইনসমূহ: বিধবা বিবাহ আইন (Widow Remarriage Act, ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দ); বিশেষ বিবাহ আইন (Special Marriage Act, ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দ); হিন্দু বিবাহ আইন (Hindu Marriage Act, ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দ) ইত্যাদি। এই আইনসমূহ বিবাহের বয়স, বহুবিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, খোরপোশের অধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে মহিলাদের স্বার্থরক্ষার চেষ্টা করে।

13. ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের বিদ্রোহী নেতানেত্রীগণ:

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতানেত্রী হলেন-

(i) দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ: মুঘল শাসনের উত্তরাধিকারী এবং অখন্ড ভারতবর্ষের প্রতীক হিসেবে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ (১৭৭৫ ১৮৬২ খ্রি.)-এর নামে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ পরিচালিত হয়েছিল। তবে প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন নামসর্বস্ব নেতা। বিদ্রোহের শেষে তাঁকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়।

(ii) বেগম হজরত মঙ্গল: অযোধ্যার শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ-এর দ্বিতীয় পত্নী ছিলেন বেগম হজরত মহল (১৮২০-১৮৭৯ খ্রি.)। তিনি নাবালক পুত্র বিরজিস কাদির-কে সিংহাসনে বসিয়ে লখনউ থেকে বিদ্রোহ চালিয়ে যান। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বিদ্রোহে হজরত মহল ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হয়ে পালিয়ে যান নেপালে।


(iii) নানাসাহেব: পেশওয়া দ্বিতীয় বাজিরাও-এর দত্তকপুত্র নানাসাহেব (১৮২৪ ১৮৫৯ খ্রি.) ভাতা বন্ধের প্রতিবাদে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুন কানপুরে বিদ্রোহ শুরু করেন। তাঁতিয়া তোপির সঙ্গে একত্রে তিনি কানপুর জয় করেন বলে জানা যায়। পরে অবশ্য ব্রিটিশরা কানপুর পুনর্দখল করলে নানাসাহেব পালিয়ে যান (সম্ভবত নেপাল)।

(iv) তাঁতিয়া টোপি: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহে কানপুর, মধ্যভারত ও বুন্দেলখণ্ড প্রভৃতি কেন্দ্রসমূহের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন তাঁতিয়া তোপি (১৮১৪-১৮৫৯ খ্রি.)। কানপুরে তিনি আজিমুল্লাহ-র সঙ্গে একজোট হয়ে নানাসাহেবের নেতৃত্বে যুদ্ধ করেন। তাছাড়া তাঁতিয়া তোপি রানি লক্ষ্মীবাঈ-এর বাহিনীর সঙ্গেঙ্গও যুক্ত হন। শিকার-এর যুদ্ধে পরাজয়ের পর ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ফাঁসি হয়।

(v) রানি লক্ষ্মীবাঈ : ঝাঁসির রাজা গঙ্গাধর রাও-এর মৃত্যুর পর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে দত্তকপুত্রের অধিকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মেনে নেয়নি। এমতাবস্থায় লর্ড ডালহৌসি স্বত্ববিলোপ নীতি প্রয়োগ করে ঝাঁসি রাজ্য গ্রাস করতে চাইলে ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ (১৮২৮/৩৫ ১৮৫৮ খ্রি.) ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেন। কোটা-কি-সরাই-এর যুদ্ধে (১৮৫৮ খ্রি.) বীরবিক্রমে লড়াই করে রানি পরাস্ত হন এবং ১৮ জুন মৃত্যুবরণ করেন।

(vi) কুনওয়ার সিং: বিহারের বিদ্রোহী নেতা ছিলেন কুনওয়ার সিং (১৭৭৭-১৮৫৮ খ্রি.)। নানা সাহেবের সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি বিদ্রোহ পরিচালনা করেছিলেন। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ২৩ এপ্রিল ব্রিটিশ বাহিনীর গুলিতে আহত হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুর পূর্বে ক্যাপটেন লে গ্রান্ড-এর বাহিনীকে পরাস্ত করেন কুনওয়ার সিং।

14. নিষ্কৃতি দিবস: ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে অধিকাংশ আসনে কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভকরে। মুসলিম লিগ বেশিরভাগ আসনেই পরাজিত হয়। এসময় মুসলিম লিগের সঙ্গে যৌথভাবে মন্ত্রীসভা গঠনে আপত্তি জানিয়ে কংগ্রেস ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ প্রদেশে মন্ত্রীসভা গঠন করে। এই ঘটনা মুসলিম লিগ ও মহম্মদ আলি জিন্নাহকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এরূপ পরিস্থিতিতে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে, ব্রিটিশ সরকার ভারতের নির্বাচিত আইনসভাগুলির সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই ভারতবর্ষকে যুদ্ধে যুক্ত করলে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে কংগ্রেসের মতপার্থক্য দেখা দেয়।

কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া: ইংরেজদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাহায্য করার পরিবর্তে কংগ্রেস যুদ্ধ শেষে ভারতের স্বাধীনতা দাবি করে। কিন্তু সেই দাবি না মানা হলে কংগ্রেস ক্ষুব্ধ হয় এবং প্রাদেশিক কংগ্রেস মন্ত্রীসভাগুলি পদত্যাগ করে।

বড়োলাট লিনলিথগোর বক্তব্য: বড়োলাট লিনলিথগো মুসলমানদের আশ্বস্ত করে জানান যে, তাদের সম্মতি ছাড়া কোনও সাংবিধানিক পরিবর্তন আনা হবে না। এই ঘটনাকে জিন্নাহ মুসলমানদের বিজয় হিসেবে গ্রহণ করেন।

মুসলিম লিগের প্রতিক্রিয়া: এই ঘটনার প্রেক্ষিতে মহম্মদ আলি জিন্নাহ ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর মুক্তি দিবস বা নিষ্কৃতি দিবস পালন করার আহ্বান জানান। এই সময় থেকেই জিন্নাহ দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রচারে জোর দেন।

15.  ১৯০৫-১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাংলার বিপ্লবী আন্দোলন সম্পর্কে লেখো।

Ans: বিংশ শতকের সূচনায় ভারতবর্ষে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল বাংলা। মূলত ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলনের ব্যাপক বিস্তার ঘটে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত বাংলার বিপ্লববাদী আন্দোলন/ বাংলার বিপ্লবী কর্মসূচি:

বাংলায় প্রথমদিকে মূলত সমিতি প্রতিষ্ঠা করে বৈপ্লবিক কাজকর্ম শুরু হয়। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে মেদিনীপুর সোসাইটি এবং সরলা ঘোষাল স্থাপিত বালিগঞ্জ-সার্কুলার রোডের ব্যায়াম সমিতি এই কাজের সম্প্রসারণ ঘটায়। ক্রমে আরও নানান গুপ্ত সমিতি গড়ে ওঠে, যেগুলির মাধ্যমে বিভিন্ন বিপ্লবী কার্যকলাপ সংঘটিত হয়।

গুপ্ত সমিতি গঠন:

অনুশীলন সমিতি: বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের পথিকৃৎ ছিল অনুশীলন সমিতি। আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯০২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে কলকাতায় প্রথম অনুশীলন সমিতি স্থাপিত হয়। সতীশচন্দ্র বসু-র উদ্যোগে ও সহায়তায় ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্র (পি মিত্র) অনুশীলন সমিতির কার্য পরিচালনা শুরু করেন এবং এই সমিতির সভাপতি হন। এই সমিতির সহকারী সভাপতি ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ ও অরবিন্দ ঘোষ, সম্পাদক ছিলেন সতীশচন্দ্র বসু এবং কোশাধ্যক্ষ ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

সমিতির আদর্শ ও শিক্ষা: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘অনুশীলন তত্ত্ব’ অনুযায়ী শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের সমন্বয়ে আদর্শ মানব ও মানবচরিত্র গঠন-ই ছিল এই সমিতির আদর্শ। শারীরিক শক্তিবৃদ্ধির জন্য এখানে নিয়মিত শরীরচর্চা, লাঠিখেলা অনুশীলন করা হত। এখানকার সদস্যদের দেশ-বিদেশের স্বাধীনতার কাহিনি, রাজনীতি, অর্থনীতি, স্বামী বিবেকানন্দের জ্ঞানযোগ, কর্মযোগ-এর মতো রচনাসমূহ ইত্যাদি পাঠ করতে হত। তাদের অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ ছিল গীতা ও আনন্দমঠ।ফাইন্যান্সিয়াল সফ্টওয়্যার

যুগান্তর দল: অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কিছুদিন পর, এই সমিতির কর্মপন্থা নিয়ে পি মিত্র-এর সঙ্গে সমিতির তরুণ বিপ্লবী বারীন্দ্র কুমার ঘোষ-সহ অনেকেরই বিরোধ বাধে। এই সকল তরুণ বিপ্লবীরা ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে যুগান্তর নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকার মাধ্যমে তাঁরা সশস্ত্র পথে গেরিলা পদ্ধতিতে সংঘর্ষের আদর্শ প্রচার করতে থাকেন। এই গোষ্ঠীর সদস্যরাই ক্রমে যুগান্তর গোষ্ঠী বা যুগান্তর দল নামে পরিচিত হন।

উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি: যুগান্তর দল অস্ত্র সংগ্রহ, বিপ্লবী ভারতীয় যুবকদের বিদেশে প্রেরণ করে অস্ত্র নির্মাণের কৌশল আয়ত্ত করা, ভবিষ্যতে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও সরঞ্জাম সংগ্রহ ইত্যাদি কর্মসূচি গ্রহণ করে। পাশাপাশি, বিপ্লবী আন্দোলনের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে স্বদেশি ডাকাতি শুরু হয়।


১] নবাব সলিমুল্লাহ কে ছিলেন? 

নবাব খাজা সলিমুল্লাহ (১৮৭১-১৯১৫) ছিলেন বিশ শতকের শুরুর দিকে পূর্ব বাংলার প্রখ্যাত মুসলিম নেতা, ঢাকার চতুর্থ নবাব, শিক্ষানুরাগী এবং নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা । তিনি ১৯০৬ সালে ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন [১,৩,৪]। বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) আন্দোলনের সময় তিনি পূর্ববঙ্গবাসীর স্বার্থ রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা নেন ।

রাজনৈতিক অবদান:

মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা: ১৯০৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় তিনি প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ।

বঙ্গভঙ্গ সমর্থন: তিনি বঙ্গভঙ্গের (১৯০৫) মাধ্যমে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য জনমত গঠন করেন ।

শিক্ষা বিস্তার: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অসামান্য অবদান রাখেন।

২] থিওডোর মরিসন কে ছিলেন ?  

থিওডোর মরিসন ছিলেন একজন ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ। তিনি ১৯০৫ সাল থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের (তখনকার মোহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ) অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের শিক্ষাদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন এবং আলিগড় আন্দোলনের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

৩] প্যান-ইসলামিক আন্দোলন কী? 

প্যান-ইসলামিক আন্দোলন (Pan-Islamism) বা সর্ব-ইসলামবাদ হলো বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের ভৌগোলিক ও জাতিগত বিভেদ ভুলে একতাবদ্ধ করার একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন । উনবিংশ শতাব্দীতে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতায় এবং খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই মতাদর্শ জনপ্রিয় হয়, যার প্রধান প্রবক্তা ছিলেন জামাল উদ্দিন আফগানি।

প্যান-ইসলামিক আন্দোলনের মূল দিকসমূহ:

লক্ষ্য: মুসলিম বিশ্বকে এক সুতোয় গেঁথে একটি একক ইসলামী রাষ্ট্র বা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা।

উদ্দেশ্য: ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির আধিপত্যের অবসান ঘটানো।

মতাদর্শ: এটি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে প্রাধান্য দেয়।

৪]  স্যাম মানেকশ কে ছিলেন? 

ফিল্ড মার্শাল স্যাম  মানেকশ , যিনি 'স্যাম বাহাদুর' (সাহসী স্যাম) নামে পরিচিত, ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রথম ফিল্ড মার্শাল এবং ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় সেনাপ্রধান। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বেই বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

প্রথম ফিল্ড মার্শাল: ১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি ভারতের প্রথম ‘ফিল্ড মার্শাল’ (পাঁচ তারকা) পদে উন্নীত হন।

কর্মজীবন: ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের অষ্টম সেনাপ্রধান (COAS) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ব্যক্তিগত: তিনি পাঞ্জাবের অমৃতসরে একটি পার্সি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং তিনি অত্যন্ত রসবোধ ও সাহসিকতার জন্য পরিচিত ছিলেন।  "স্যাম বাহাদুর" নামটি তাকে নেপালি সৈন্যরা দিয়েছিলেন, যা ছিল তার সাহসিকতার প্রতীক।

 ৫] অপারেশন চেঙ্গিস খান কী? 

অপারেশন চেঙ্গিস খান ছিল ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় পাকিস্তানি বিমান বাহিনী কর্তৃক ভারতের বিমানঘাঁটিগুলোতে পরিচালিত একটি আকস্মিক ও পূর্বপরিকল্পিত বিমান হামলা, যা আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সূচনা করে । পাকিস্তান পশ্চিম সীমান্তে ১১টি ভারতীয় বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানে । লক্ষ্য ছিল ভারতের বিমান ক্ষমতাকে আগাম ধ্বংস করা, কিন্তু ভারত আগেই সতর্ক থাকায় এই আক্রমণ ব্যর্থ হয়।

অপারেশন চেঙ্গিস খানের মূল দিকসমূহ:

প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়লে, পশ্চিম দিক থেকে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে এই হামলা চালানো হয়।

।আক্রমণকাল: ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১, সন্ধ্যা প্রায় ৫:৪০ মিনিট।

লক্ষ্যবস্তু: অমৃতসর, পাঠানকোট, শ্রীনগর, অবন্তিপুর, আম্বালা, যোধপুর, আগ্রাসহ উত্তর ও পশ্চিম ভারতের মোট ১১টি বিমানঘাঁটি।

ফলাফল: পাকিস্তান প্রত্যাশিত সফলতা পায়নি কারণ ভারতীয় বিমান বাহিনী আগেই তাদের বিমানগুলোকে সুরক্ষিত বাঙ্কারে সরিয়ে নিয়েছিল।

৬] ভারতের সংবিধানের রচয়িতা কারা? 

ভারতের সংবিধানের প্রধান রচয়িতা এবং খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান হলেন ড. বি. আর. আম্বেদকর (ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকর)। তাঁকে "ভারতের সংবিধানের জনক" বা ‘Architect of Indian Constitution’ বলা হয়। খসড়া কমিটি ১৯৪৭ সালের ২৯শে আগস্ট সংবিধান তৈরির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। 

ভারতের সংবিধানের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

প্রধান খসড়া রচয়িতা: ড. বি. আর. আম্বেদকর।

হাতে লেখা (Calligrapher): মূল সংবিধান ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় হাতে লিখেছিলেন প্রেম বিহারী নারায়ণ রাইজাদা।

সাংবিধানিক উপদেষ্টা: বিএন রাউ (B.N. Rau)।

গৃহীত ও কার্যকর: ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি কার্যকর হয়।

৭] PPP মডেল (Public Privet Partnership) কী?

পিপিপি (PPP - Public-Private Partnership) মডেল হলো সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব, যার মাধ্যমে রাস্তা, সেতু, হাসপাতাল বা স্কুলের মতো বড় প্রকল্পের অর্থায়ন, নির্মাণ এবং পরিচালনা করা হয়। এই মডেলে সরকার জমি ও নীতিগত সহায়তা দেয় এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে পরিষেবা প্রদান করে।

পিপিপি মডেলের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও বিষয়সমূহ:

অংশীদারিত্ব: সরকারি (Public) এবং বেসরকারি (Private) খাতের মধ্যে চুক্তিভিত্তিক যৌথ কাজ। 

ঝুঁকি বণ্টন: প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি ঝুঁকি উভয় পক্ষের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হয়।

অর্থায়ন ও পরিচালনা: বেসরকারি খাতের দ্বারা অর্থায়ন এবং একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে তা পরিচালনার মাধ্যমে (যেমন- BOT, BOO মডেল) রাজস্ব আদায়। 

৮] গানবোট কূটনীতি কী? 

গানবোট কূটনীতি (Gunboat Diplomacy) হলো এমন একটি আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি, যেখানে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র তার সামরিক শক্তি—বিশেষ করে নৌবাহিনীকে—দুর্বল কোনো দেশের উপকূলে প্রদর্শন বা মোতায়েন করে কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করে । এটি যুদ্ধের সরাসরি হুমকি ছাড়াই ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করার একটি পদ্ধতি ।

মূল বৈশিষ্ট্য ও উদাহরণ:

সামরিক ভীতি: ১৯শ ও ২০শ শতাব্দীর শুরুর দিকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো (যেমন- ব্রিটেন, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র) এই কৌশল বেশি ব্যবহার করত।

উদ্দেশ্য: সাধারণত অসম বাণিজ্য চুক্তি, ঋন আদায় বা রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা অর্জনের জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।

৯] অপারেশন ট্রাইজেন্টট কী ? 

১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের বন্দর নগরী করাচিতে ভারতীয় নৌবাহিনী দ্বারা একটি অপারেশন পরিচালনা করা হয় যা ইতিহাসে অপারশন ট্রাইডেন্ট নামে পরিচিত । আর এই অপারেশন ট্রাইজেন্ট এর যুদ্ধে এই অঞ্চলের মানুষেরা প্রথমবারের মত এন্টি জাহাজ মিসাইল (মিসাইল প্রতিরধক জাহাজ) এর ব্যবহার দেখতে পেরেছিলো । এই অপারেশনটি ১৯৭১ সালের ৪-৫ ডিসেম্বরে গভীর রাতে পরিচালনা করা হয়েছিলো যার ফলে সে অপারেশনের কারণে পাকিস্তানের জাহাজের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয় । অপারেশন ট্রাইডেন্ট পরিচালনার ফলে ভারতের তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও পাকিস্তানের প্রচুর ক্ষতি হয়েছিলো । 

১০] অপারেশন পাইথন কী ? 

অপারেশন পাইথন ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় অপারেশন ট্রাইডেন্টের পর পশ্চিম পাকিস্তানের বন্দর শহর করাচিতে ভারতীয় নৌবাহিনী পরিচালিত একটি নৌ-হামলার ছদ্মনাম। করাচি বন্দরে অপারেশন ট্রাইডেন্টের প্রথম হামলার পর প্রচুর ভারতীয় নৌ-জাহাজের উপস্থিতি দেখে অন্য আরেকটি হামলা পরিকল্পনার কথা আশঙ্কা করে পাকিস্তান তাদের উপকূলবর্তী এলাকায় আকাশপথে নজরদারি জোরদার করে এবং বাণিজ্য জাহাজের সাথে যুদ্ধ জাহাজ মিশিয়ে ভারতীয় নৌবাহিনীকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে। এই পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭১ সালের ৮/৯ ডিসেম্বর ভারত অপারেশন পাইথন পরিচালনা করে। তারা একটি মিসাইল বোট এবং দুইটি ফ্রিগেট নিয়ে করাচি উপকূলের অদূরে নোঙর করা জাহাজগুলোকে আক্রমণ করে। ভারতের কোন ক্ষয়ক্ষতি না হলেও পাকিস্তানি ট্যাংকার  মেরামতের অযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ।

১১] লঙ্গেওয়ালার যুদ্ধ কী ? 

লঙ্গেওয়ালার যুদ্ধ ( ৪-৭ ডিসেম্বর ১৯৭১) ছিল ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পশ্চিমাঞ্চলে প্রথম প্রধান যুদ্ধগুলির মধ্যে একটি। এই যুদ্ধ রাজস্থানের থর মরুভূমিতে লঙ্গেওয়ালার ভারতীয় সীমান্ত চৌকিতে আক্রমণকারী পাকিস্তানি বাহিনী এবং ভারতীয় রক্ষকদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল । এই যুদ্ধে ১২০ জন ভারতীয় সৈন্য, চারটি হকার্স হান্টার এবং তিনটি এইচএএল মারুত যুদ্ধবিমান এবং ২০০০-৩,০০০ পাকিস্তানি সৈন্য এবং ৪০টি ট্যাঙ্ক অংশগ্রহণ করেছিল। এটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইতিহাসের অন্যতম সেরা যুদ্ধ এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে একটি সামরিক বিজয় হিসাবে বিবেচিত হয় ।

১২] ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি কী ? 

১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট স্বাক্ষরিত ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে নয়াদিল্লিতে স্বাক্ষরিত একটি যুগান্তকারী কৌশলগত চুক্তি। এটি ছিল ২০ বছর মেয়াদী, যা মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চীন-যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান অক্ষের বিরুদ্ধে ভারতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করেছিল। এই চুক্তির ফলে ভারত জোটনিরপেক্ষ অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়। 

স্বাক্ষর: ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট, নয়াদিল্লিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বর্ণ সিং (ভারত) এবং আন্দ্রে গ্রোমিকো (সোভিয়েত ইউনিয়ন) এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

১৩] মিশ্র অর্থনীতি বলতে কী বোঝ ? 

মিশ্র অর্থনীতি হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে পুঁজিবাদী (ব্যক্তিগত মালিকানা) এবং সমাজতান্ত্রিক (রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ) উভয় ব্যবস্থার উপাদান একসাথে কাজ করে। এখানে বেসরকারী খাত মুনাফার জন্য কাজ করে এবং সরকার জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সম্পদ বণ্টনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে । এটি মূলত মুক্ত বাজার ও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের একটি সমন্বয়।  ব্যক্তিরা উৎপাদনের উপায়, ব্যবসার মালিকানা এবং মুনাফা অর্জনের স্বাধীনতা পায় , আবার সরকার মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বা জনস্বার্থের জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ।


No comments:

Post a Comment