1. যে কোন চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও :- (3×4=12)
a) অ্যারিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তা আলোচনা করো। **
Answer:- গ্রিক রাষ্ট্রচিন্তাবিদ অ্যারিস্টটল তাঁর 'দ্য পলিটিক্স' গ্রন্থটিতে রাষ্ট্রধারণায় এক বাস্তববাদী রাষ্ট্রের নানাদিক তুলে ধরেছেন। তিনি তাঁর রাষ্ট্রধারণায় রাষ্ট্র, সরকার, সংবিধান এমনকি রাষ্ট্রের সমস্যার নানা দিক বাস্তব সম্মতভাবে পর্যালোচনা করেছেন।
I) রাষ্ট্রধারণার উৎস: অ্যারিস্টটলের রাষ্ট্রধারণাকে প্রভাবিত করেছিল পারিবারিক জীবন । শাপাশি তিনি তাঁর শিক্ষক ও গুরু প্লেটোর চিন্তাধারা দ্বারাও গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। গ্রিক নগর-রাষ্ট্রের পতনের সূচনা তার রাষ্ট্রধারণার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
II) রাষ্ট্র জীবদেহস্বরূপ: অ্যারিস্টটলের মতে রাষ্ট্র হল জীবদেহের মতো। একটি জীবের শরীরে যেমন নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থাকে, রাষ্ট্রেরও তাই।মানুষের শরীরে হাত, পা, চোখ, কান এসব হল অবিচ্ছেদ্য অংশ । ঠিক একইরকমভাবে রাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক বিচার, আইন এসবের সঙ্গে যুক্ত নাগরিকরা রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
III) ত্রিস্তর ভিত্তিক: অ্যারিস্টটলের রাষ্ট্রধারণায়, রাষ্ট্র গড়ে ওঠে তিনটি স্তরের ওপর ভিত্তি করে, যথা-পরিবার গ্রাম → রাষ্ট্র। অ্যারিস্টটল দেখিয়েছেন ব্যক্তি পরিবার গড়ে তোলে, আর পরিবারগুলি মিলে গড়ে ওঠে গ্রাম, তারপর গ্রামগুলি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়।
IV) রাষ্ট্র একটি স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠান: অ্যারিস্টটল তাঁর কিছু বৈজ্ঞানিক ভাবনাচিন্তা ও যুক্তির ওপর ভিত্তি করে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র হল একটি স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠান।
মূল্যায়ন: রাষ্ট্রচিন্তাবিদ হিসেবে অ্যারিস্টটলের স্থান প্লেটোর থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অ্যারিস্টটলের রাষ্ট্রধারণা শুধু গ্রিক সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল এক বিশ্বব্যাপী সার্বজনীন রাষ্ট্রধারণা।
b) জন লকের রাষ্ট্র চিন্তা আলোচনা করো। **
c) আধুনিক বিজ্ঞানচর্চায় রজার বেকনের অবদান কী ছিল?*
▶ ইউরোপীয় রেনেসাঁকালে ইংল্যান্ডের এক স্বনামধন্য বিজ্ঞানী ছিলেন রজার বেকন। তিনিই প্রথম বিজ্ঞানচর্চায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর জোর দিয়েছিলেন। সে-কারণে তাঁকে 'আধুনিক বিজ্ঞানের জনক' বলা হয়।
রজার বেকনের লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ হল-ওপাস মাজুস । এটি লাতিন ভাষায় লিখিত। এতে স্থান পেয়েছে ব্যাকরণ, যুক্তিবিদ্যা, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও দর্শন। এটি সাতটি ভাগে বিভক্ত। গ্রন্থটির পঞ্চম খণ্ডে আলোর প্রতিসরণ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। অনেকের মত যে, তিনিই চশমার কাচ আবিষ্কার করেছিলেন। খুব সম্ভবত তিনিই ইউরোপে প্রথম গান পাউডার বা বারুদের ফর্মুলা ব্যবহার করেছিলেন । বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর কতকগুলি ভবিষ্যদ্বাণী আশ্চর্যভাবে মিলে গেছে। যেমন-অশ্ববিহীন যান বা মোটরগাড়ি, পালবিহীন জাহাজ বা স্টিমার ইত্যাদি।
d) নব্য রাজতন্ত্র কী ? টমাস ক্রমওয়েল ও তার নব্য রাজতন্ত্র তত্বের ব্যাখ্যা দাও । **
Answer:- ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসে টমাস ক্রমওয়েলের অবদান অপরিসীম । তাঁকে আধুনিক ইংল্যান্ডের রূপকার বলা হয়।
[1] নব্য রাজতন্ত্রের ধারা: ইংল্যান্ড রাজ সপ্তম হেনরি প্রতিষ্ঠিত টিউডর রাজতন্ত্রকে ঐতিহাসিক জন রিচার্ড গ্রিন সর্বপ্রথম 'নব্য রাজতন্ত্র' (New Monarchy) আখ্যা দেন। অষ্টম হেনরির শাসনকালে রাজার প্রধান উপদেষ্টা এবং সচিব টমাস ক্রমওয়েলের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড এক আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
[2] জাতীয় সার্বভৌমত্ব ধারণার প্রতিষ্ঠা: রিফরমেশন পার্লামেন্টে টমাস ক্রমওয়েল দুটি আইন পাস করিয়ে ইংল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। অ্যাক্ট অব অ্যাপিলস (Act of Appeals) নামে প্রথম আইনটি পাসের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের রাজাকে সার্বভৌম বলে ঘোষণা করা হয়। বলা হয়, রাজা হলেন সমস্ত ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক গোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভু। 'অ্যাক্ট অব সুপ্রিমেসি' নামে দ্বিতীয় আইনটি পাস করিয়ে রাজার প্রতি আনুগত্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়।
[3] চার্চের ওপর রাজার অধিকার : টমাস ক্রমওয়েল বলেন রাজা হলেন চার্চের প্রশাসনিক প্রধান। এই ঘোষণার পর চার্চের প্রধান হিসেবে অষ্টম হেনরি চার্চের ওপর যাবতীয় প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
[4] সংসদীয় আইনের প্রাধান্য: টমাস ক্রমওয়েল সর্বপ্রথম সংসদীয় আইনের গুরুত্ব অনুভব করেন। সংসদ অনুমোদিত আইনগুলিকে তিনি জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে শুরু করেন।
[5] জাতীয় রাষ্ট্র গঠন: ক্রমওয়েল জাতীয় প্রশাসন গঠনের মাধ্যমে জাতীয় রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপট রচনা করেন। ইংল্যান্ড অচিরেই এক জাতীয় রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
e) কোপারনিকাস । **
Ans:-নিকোলাস কোপার্নিকাস ছিলেন আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক। তিনি ছিলেন রেনেসাঁ যুগের একজন গণিতবিদ এবং জ্যোতির্বিদ। একই সাথে তিনি ছিলেন বহু ভাষাবিদ, চিকিৎসক, অনুবাদক, কূটনীতিবিদ এবং অর্থনীতিবিদ। তিনিই সর্বপ্রথম আধুনিক সূর্যকেন্দ্রিক সৌরজগতের মতবাদ প্রদান করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে, পৃথিবী নয়, সৌরজগতের কেন্দ্রে অবস্থান করছে সূর্য। তিনিই সর্বপ্রথম বলেন যে, সূর্য স্থির রয়েছে এবং সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহগুলি নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরছে। তিনি আরও বলেন যে, শুক্র ও মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করছে পৃথিবীর কক্ষপথ। তাঁর ধারণায় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রে রয়েছে সূর্য।
কোপারনিকাস তাঁর জ্যোতির্বিদ্যার আলোচনায় দিনক্ষণের পূর্বাভাস, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের লগ্ন, চন্দ্রগ্রহণ প্রভৃতি বিষয়ে বিভিন্ন আভাস দেন। তিনি তাঁর সৌরকেন্দ্রিক মতবাদকে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন 'Six Books on the Revolutions of the Celestial Spheres' নাম দিয়ে। বইটি প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়।
f) তাওবাদ সম্পর্কে আলোচনা করো।
Answer:- তাওবাদ হল প্রাচীন চিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম-দর্শন। চিন ছাড়াও জাপান, তাইওয়ান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশে তাওবাদের প্রভাব লক্ষ করা যায়। তাওবাদী দর্শনের লক্ষ্য হল মানবজীবনের পূর্ণতা।
[1] শান্তি: তাওবাদী দর্শনের অন্যতম লক্ষ্য হল শান্তি। তাওবাদ মনে করে যে, প্রকৃতির আবর্তনের সঙ্গে মানুষ সামঞ্জস্য বিধান করে চলতে পারলে শান্তি পাবে এবং মানবজীবন পূর্ণতা লাভকরবে।
[ 2] ভারসাম্য: তাওবাদের অন্যতম লক্ষ্য হল মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। মানুষ প্রকৃতির সাথে সঙ্গতি রেখে তার জীবনযাত্রা প্রাকৃতিক নিয়মকানুনের মাধ্যমে পরিচালিত করলে তার জীবনে পূর্ণতা আসবে।
[ 3] মানুষ ও প্রকৃতির সমন্বয়: তাওবাদে বলা হয়েছে যে, মানুষের শরীরই একটি পৃথিবী। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য মানুষ দায়ী। কেন-না, মানুষের পাপাচারের জন্য প্রকৃতির ভারসাম্য ক্ষুণ্ণ হয়।
[4]সরল জীবন: তাওবাদীরা বিশ্বাস করে যে মানুষের উচিত সরল জীবনযাপন করা এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র থেকে মুক্ত থাকা।
[5] অকর্ম: তাওবাদীরা বিশ্বাস করে যে মানুষের উচিত প্রাকৃতিক প্রবাহের সাথে থাকা এবং জোর করে কিছু পরিবর্তন করার চেষ্টা না করা।
[6] অহিংসা: তাওবাদীরা সকল প্রাণীর প্রতি অহিংসার নীতিতে বিশ্বাস করে।
g) অ্যালকেমি বা অপরাসায়ন বিদ্যা কী? *
Ans:- অ্যালকেমি (Alchemy) বা অপরসায়ন হলো একটি প্রাচীন বিজ্ঞান ও দর্শনের ধারা, যার মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ ধাতু যেমন সীসাকে সোনায় রূপান্তর করা। সকল রোগের নিরাময় এবং অমরত্বের ঔষধ আবিষ্কার করা।
অ্যালকেমির মূল বিষয়বস্তু:
রূপান্তর (Transmutation): সীসা বা তামার মতো 'ক্ষুদ্র ধাতু'কে সোনা বা রুপার মতো 'মহৎ ধাতু'তে পরিণত করার চেষ্টা করা হতো।
রোগ নিরাময়: সকল রোগ নিরাময় এবং জীবন দীর্ঘায়িত করার উপায় খুঁজে বের করাও ছিল এর উদ্দেশ্য।
অ্যালকেমির গুরুত্ব:
এটি আধুনিক রসায়নের পূর্বসূরি, যা পরীক্ষামূলক পদ্ধতি এবং ল্যাবরেটরির সরঞ্জাম আবিষ্কারে সাহায্য করেছে।
অ্যালকেমিস্টরা আর্সেনিক, অ্যান্টিমনি, জিঙ্কের মতো মৌলিক পদার্থগুলো প্রথম পৃথক করেন।
এটি পদার্থবিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র ও আধ্যাত্মিকতার মতো জ্ঞান শাখাগুলোকে একত্রিত করে একটি উচ্চতর সত্যের সন্ধানে নিয়োজিত ছিল।
g) লিওনাদো দা ভিঞ্চি । **
h) রাফায়েল।
Answer:-রাফায়েল ছিলেন ইউরোপের রেনেসাস যুগের একজন বিখ্যাত শিল্পী। তিনি তাঁর সুষম, সুন্দর এবং আবেগপূর্ণ শিল্পকর্মের জন্য বিখ্যাত ছিলেন।
I) দ্য স্কুল অফ এথেন্স: রাফায়েল অঙ্কিত 'দ্য স্কুল অফ এথেন্স' রেনেসাঁস যুগের একটি বিখ্যাত চিত্র, যেটির দৈর্ঘ্য ৭৭০ সেন্টিমিটার। প্রাচীন পৃথিবীর ইতিহাসের যেসব মহান মানুষ আধুনিক পৃথিবীর ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন, তাঁদেরকে একই ফ্রেমে আবদ্ধ করেছেন শিল্পী রাফায়েল।
II) ম্যাডোনা: রেনেসাঁস যুগে রাফায়েল ম্যাডোনার অসংখ্য ছবি এঁকেছিলেন।ম্যাডোনা হচ্ছেন জিশু খ্রিস্টের কুমারী মাতা মেরি। এই চিত্রটিতে পবিত্রতা ও সৌন্দর্যের এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়।
III) দ্য ট্রান্সফিগারেশন: ১৫২০ সালে রাফায়েল তাঁর সর্বশেষ ছবি 'দ্য ট্রান্সফিগারেশন' এঁকেছিলেন। এই ছবিটি তিনি বাইবেলের কাহিনি অবলম্বনে অঙ্কন করেন। ছবিটির উপরের অংশে খ্রিস্টের মানব শরীরে রূপান্তর এবং নীচের অংশে খ্রিস্টের দ্বারা শয়তানের হাত থেকে এক শিশুর মুক্তি চিত্রিত হয়েছে।
● উপসংহার: রাফায়েল রেনেসাঁস শিল্পকলার একজন মুখ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার শিল্পকলা রেনেসাঁস শিল্পকলার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল। মাত্র ৩৭ বছরের স্বল্প জীবনে রাফায়েলের শিল্পকর্ম আজও সৌন্দর্য এবং আবেগের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত।
j) জিয়াউদ্দিন বারনী বর্নিত সুলতানী যুগের নরপতিদের আদর্শ কী ছিল?
অথবা,
ফতোয়া -ই -জাহান্দারি গ্রন্থে বর্নিত রাজতন্ত্রের বর্ননা দাও। ****
Ans:- সুলতানি যুগের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারনী তার ফতোয়া-ই - জাহান্দারি গ্রন্থে রাষ্ট্রের প্রকৃতি আলোচনার সঙ্গে নরপতিদের আদর্শ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। যথা -
● বারনি বর্ণিত সুলতানি যুগে নরপতিত্বের আদর্শ:۔۔
[1] ইসলামীয় কর্তব্য পালন: বারনি সুলতানকে তাঁর শাসনকাজে ইসলামকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। ইসলামের আদর্শ সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য সুলতানের হাতে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব থাকা উচিত বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
[2] বংশকৌলিন্য: বারনি তাঁর 'ফতোয়া-ই-জাহান্দারি' গ্রন্থে সর্বোচ্চ ক্ষমতার ব্যবহারকারী হিসেবে সম্রাটের বংশকৌলীন্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাঁর মতে, সম্রাট বা সুলতান যদি উচ্চ ও পরাক্রমশালী রাজবংশের হন, তবে সাধারণ প্রজাদের মনে তাঁর সম্পর্কে উচ্চ ধারণা তৈরি হবে এবং স্বাভাবিকভাবেই তিনি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য লাভ করবেন।
[3] ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: বারনি বলেছেন, শাসকের প্রধান কর্তব্য হল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। এর মাধ্যমে শাসক বা সুলতান ঈশ্বরের রাজ্যে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রজাদের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করবেন।
[4] শরিয়তের বিধান অনুসরণ: বারনির মতে, একজন শাসক শরিয়ৎ মেনে সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।
[5] মন্ত্রী সভার সিদ্ধান্ত গ্রহণ: বারনি বলেছেন যে, রাজাকে অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ পারিষদদের নিয়ে একটি মন্ত্রী সভা গঠন করতে হবে। রাজা কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সেই সভার পরামর্শদাতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
k) প্রতিসংস্কার আন্দোলন বলতে কী বোঝো? এর উদ্দেশ্য কী ছিল?*
▶ প্রোটেস্টান্ট মতবাদকে দমন করে ক্যাথোলিক ধর্মমতকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য চার্চের অভ্যন্তরে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়। ফলে ইটালি, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স ও স্পেনে ক্যাথোলিক চার্চের সংস্কারসাধনের জন্য জোরালো দাবি ওঠে। একে বলা হয় Counter Reformation বা প্রতিসংস্কার আন্দোলন, যা প্রথম শুরু হয় স্পেনে।
এই প্রতিসংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে-ক্যাথোলিক চার্চগুলির অভ্যন্তরীণ সংস্কারের কাজ শুরু হয়, যেমন-
① যাজকরা যাতে চরিত্রবান হয় এবং নৈতিকতার পথে পরিচালিত হয় সেদিকে নজর দেওয়া হয়।
② প্রচারকে হাতিয়ার করে ও বলপূর্বক প্রোটেস্টান্টদের ক্যাথোলিক মতবাদে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এককথায় এই আন্দোলন ছিল ক্যাথোলিক ধর্মের শুদ্ধিকরণের আন্দোলন। যার দ্বারা চার্চগুলিকে দুর্নীতিমুক্ত করা যায় এবং সেই সঙ্গে চার্চ ও ক্যাথোলিক ধর্মের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা যায়।
l) শিন্টো ধর্মের মূল বিশ্বাসগুলি কী কী?
Ans: শিন্টো ধর্ম জাপানের আদি ধর্ম। এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ধর্মপ্রচারকের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি বরং জাপানিদের প্রকৃতি ও পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধার উপর ভিত্তি করে শিন্টো ধর্মের বিকাশ ঘটেছে। শিন্টো ধর্মের কোনো নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ বা নীতিমালা নেই, বরং এর বিশ্বাস ও রীতিনীতি মৌখিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে। এই ধর্মের মূল বিশ্বাসগুলি হল-
[1] কামি: শিন্টো ধর্মের মূল বিশ্বাস হল 'কামি' ধারণা। কামি হল প্রকৃতির আত্মা, যা সকল জিনিসের মধ্যে বিদ্যমান। কামি পাহাড়, নদী, গাছপালা, এমনকি পাথর ও প্রাণীতেও বাস করে। শিন্টো ধর্ম অনুসারে, কামি মানুষের জীবনে সুখ ও দুঃখ দান করতে পারে।
[2] পূর্বপুরুষদের পূজা: শিন্টো ধর্মে পূর্বপুরুষদের পূজা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিন্টোদের বিশ্বাস, তাদের পূর্বপুরুষরা কামি হয়ে তাদের জীবনে প্রভাব বিস্তার করে।
[3] পূজার উপকরণ: পূজার সময় শিন্টো ধর্মাবলম্বীরা বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে, যার মধ্যে রয়েছে 'ও-মি-কুজি' (কাঠের বাঁশি), 'শিমেনাওয়া' (পবিত্র দড়ি), 'গো-হেই' (পবিত্র কাগজ), 'সাকি' (চালের ওয়াইন), 'ফল', 'ফুল' প্রভৃতি।
[4 ] পূজার রীতিনীতি: শিন্টো ধর্মাবলম্বীরা বিভিন্ন রীতিনীতি পালন করে, যেমন—'হাত ধুয়ে পবিত্রতা অর্জন', 'প্রার্থনা', 'উৎসর্গ', 'ঘণ্টা বাজানো', 'নৃত্য', 'হাততালি দেওয়া' প্রভৃতি।
[5] উৎসব: শিন্টো ধর্মাবলম্বীরা বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উৎসব পালন করে। এই উৎসবগুলি 'কামি' অর্থাৎ আত্মাকে ধন্যবাদ জানাতে এবং তাদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করার জন্য পালন করা হয়।
2. যে কোন চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও:- (4×5=20)
a) সুলতানী রাষ্ট্রের প্রকৃতি আলোচনা করো । ****
b) চিনের ম্যান্ডারিন ব্যবস্থার সম্পর্কে আলোচনা করো। ****
c) পারস্যের হ্মত্রপ ব্যবস্থার সম্পর্কে আলোচনা করো। ****
d) ইকতা ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করো। **
Answer:- দিল্লির সুলতানি শাসনকালে প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ছিল ইক্তা প্রথা। ইক্তা গ্রহণকারীরা মাক্তি বা ইক্তাদার নামে পরিচিত ছিল।ইক্তা শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল একটি অংশ বা এলাকা। ল ভূমি থেকে উৎপাদিত শস্যের ওপর বিশেষ কোনো ব্যক্তিবর্গকে সরকার কর্তৃক অধিকারদান। সম্ভবত খলিফা মুক্তাদি ইক্তা ব্যবস্থার উদ্ভাবন ঘটান। ভারতে ত্রয়োদশ শতকের সূচনা পর্বে দিল্লির সুলতান ইলতুৎমিস ইক্তা প্রথার প্রবর্তন করেন।
● উদ্দেশ্য: ইক্তা ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে দিল্লির সুলতানরা কয়েকটি উদ্দেশ্য পূরণ করতে চেয়েছিলেন। সুলতানগণ ইত্তা প্রদানের মধ্যে দিয়ে আসলে আমির-ওমরাহদেরই সন্তুষ্ট করতে চেয়েছিলেন।নতুন নতুন বিজিত অঞ্চলগুলি। থেকে রাজস্ব আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এই অনিশ্চয়তা দূরীকরণের লক্ষ্যে ইক্তাদারদের নিয়োগ করা হয়।
বৈশিষ্ট্য: 'ইক্তা' ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল-(a) 'ইক্তা' গ্রহীতাগণ পরিচিত ছিলেন মাক্তি বা ইক্তাদার নামে।
(b) ইক্কাদাররা কৃষকদের কাছ থেকে নিয়মিত রাজস্ব আদায় করতেন।
(c) রাজস্ব পরিশোধকারী প্রজাদের জীবন, সম্পত্তি ও পরিবারের ওপর ইক্তাদারদের কোনো অধিকার ছিল না।
(d) ইক্তাদারদের নিজস্ব সেনাবাহিনী রাখতে হত। প্রয়োজনে সুলতানকে সেই সেনা সরবরাহ করতে হত।
ইক্তাব্যবস্থার বিবর্তন :- ইক্তা প্রথা প্রবর্তনের পর সুলতান ইলতুৎমিস তাকে এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে উদ্যোগী হন। কোনো ইক্তার ওপর বংশানুক্রমিক অধিকার যাতে গড়ে না ওঠে, তার জন্য তিনি ইত্তাদারদের বদলির নীতি নেন। আলাউদ্দিন খলজি সেনাদের ইক্তাদানের পরিবর্তে নগদ বেতনদানের প্রথা চালু করেন। ফিরোজশাহ তুঘলক ব্যাপক-ভাবে ইক্তা বিতরণ করলে খালিসা জমির পরিমাণ কমে। তিনি ইক্তা ব্যবস্থাকে বংশানুক্রমিক করে দেন।
e) ভক্তিবাদ সম্পর্কে আলোচনা করো। ****
Answer:- ভক্তিবাদ হলো ঈশ্বরের প্রতি গভীর প্রেম, শ্রদ্ধা ও নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের একটি ধর্মীয় ও দার্শনিক মতবাদ, যা মুক্তি লাভের পথ হিসেবে ভক্তি বা গভীর অনুরাগকেই প্রধান উপায় মনে করে; এটি মূলত মধ্যযুগীয় ভারতে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলন, যা বর্ণপ্রথা ও জটিল আচার-অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করে ঈশ্বরের সঙ্গে ব্যক্তিগত সংযোগ স্থাপনের উপর জোর দেয়।
মূল ধারণা ও বৈশিষ্ট্য:
ঈশ্বরের প্রতি প্রেম (Bhakti): ভক্তিবাদ ঈশ্বরের প্রতি ব্যক্তিগত, গভীর ও আবেগপূর্ণ ভালোবাসার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যেখানে ঈশ্বরের সেবা বা আরাধনা করা হয়।
মুক্তি (Moksha): বিশ্বাস করা হয় যে, ঈশ্বরের প্রতি ভক্তির মাধ্যমে মানুষ মোক্ষ বা মুক্তি লাভ করতে পারে।
আচার-অনুষ্ঠানের বিরোধিতা: এটি জটিল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও পুরোহিতদের মধ্যস্থতার পরিবর্তে সরল ভক্তি ও প্রেমের মাধ্যমে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর কথা বলে।
সামাজিক সমতা: ভক্তিবাদ বর্ণপ্রথাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং প্রচার করে যে, সকল মানুষ, তাদের সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে, ঈশ্বরের ভক্তি করতে পারে এবং আধ্যাত্মিক মুক্তি পেতে পারে।
স্থানীয় ভাষা: সাধকরা নিজেদের ভক্তিগীতি ও উপদেশ স্থানীয় ভাষায় প্রচার করতেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে সাহায্য করে।
f) ক্রুসেড বলতে কী বোঝ ? এর কারন আলোচনা করো। ***
Ans:- খ্রিস্টধর্মের পবিত্র প্রতীক ক্রুশ থেকে ক্রুসেড নামের উৎপত্তি ঘটেছে। ক্রুসেড অর্থাৎ ধর্মযুদ্ধ। ব্যাপক অর্থে পবিত্র ভূমি জেরুজালেমের ওপর আধিপত্য বা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে খ্রিস্টান ও প্রাচ্যের মুসলমানদের মধ্যে ভয়াবহ যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় তাই ক্রুসেড।একাদশ শতক থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ২০০ বছরব্যাপী এই যুদ্ধ চলে।
[1] ধর্মীয় কারণ: জেরুজালেম খ্রিস্টানদের কাছে একটি অত্যন্ত পবিত্র স্থান। সেলজুক তুর্কি মুসলিমদের অধীনে জেরুজালেমে খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীদের উপর নির্যাতন করা হত।
[2 ] রাজনৈতিক কারণ: পোপ দ্বিতীয় আরবান ক্রুসেডকে পোপের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। খ্রিস্টান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সেলজুক তুর্কিদের আক্রমণের সম্মুখীন হলে খ্রিস্টানদের মনে প্রতিশোধের আকাঙ্খা জেগে ওঠে। সাংস্কৃতিক পরম্পরার পরিবর্তন ছাড়া ইউরোপীয় রাজারা ক্রুসেডকে তাদের ক্ষমতা ও সম্পদ বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে দেখেছিল।
[3] অর্থনৈতিক কারণ: ইউরোপীয়রা মধ্যপ্রাচ্যের লাভজনক বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে মুসলিমদের পদানত করার প্রয়োজন ছিল। তা ছাড়া ক্রুসেডের যোদ্ধারা যুদ্ধের মাধ্যমে ভূমি, সম্পদ ও ধন-সম্পদের অধিকারী হওয়ার আশা করত।
[4] সামাজিক কারণ: মধ্যযুগীয় ইউরোপে অশান্তি ও সহিংসতা ছিল একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। অনেক ইউরোপীয় তাদের একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে ক্রুসেডে যোগ দেয়।
উপসংহার: ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ ছিল একটি জটিল ঘটনা। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করেছিল। কুসেডগুলি ছিল জেরুজালেম অধিকার ও তার নিরাপত্তার লক্ষ্যে সংঘটিত ধর্মযুদ্ধ।”
g) মুদ্রন বিপ্লবের কারন ও প্রভাব আলোচনা করো।**
Answer:- পঞ্চদশ শতকে ইউরোপে মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার নবজাগরণের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল। জোহানেস গুটেনবার্গ মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার করেন এবং সর্বপ্রথম ১৪৫৪ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির মেইনজ শহরে মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করেন। ইউরোপে মুদ্রণযন্ত্রের প্রসার জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। যেমন-
[1] মুদ্রণযন্ত্রের প্রসার: পরবর্তী অর্ধ শতকের মধ্যেই ইউরোপের সর্বত্র প্রচুর মুদ্রণযন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে পূর্বতন হাতে লেখা পুঁথির দিন শেষ হতে থাকে এবং যন্ত্রের সাহায্যে অল্প সময়ে প্রচুর বই ছাপা হয়ে বাজারে আসতে থাকে।
[2] বই প্রকাশ: যন্ত্রের মাধ্যমে বই প্রকাশ হতে শুরু করলে নতুন বই ব্যাবসা গড়ে ওঠে। এই ব্যাবসার সঙ্গে যুক্ত লাইব্রেরি ও পুস্তক বিক্রেতারা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বইয়ের মানোন্নয়নে আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। পরিমার্জিত, পরিবর্ধিত ও সংশোধিত বইপত্র প্রকাশিত হতে থাকে যা জ্ঞানার্জনকে সমৃদ্ধ করে।
[3] অনুবাদ: মুদ্রণযন্ত্রের প্রসারের পর বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হতে থাকে। ফলে বিভিন্ন দেশের মানুষ নিজেদের মাতৃভাষায় বহু জ্ঞানগর্ভ বইপত্র পড়ার সুযোগ পায়।
[4 ] প্রাচীন জ্ঞানের প্রত্যাবর্তন: মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হলে ধ্রুপদি যুগের বিভিন্ন মূল্যবান বইপত্র নতুন করে ছাপা হয়ে পাঠকদের হাতে আসতে থাকে। মুদ্রণযন্ত্রের দৌলতে অ্যারিস্টটল, প্লেটো, টলেমি প্রমুখের রচনা ইউরোপের মানুষ নতুন করে পড়ার সুযোগ পায়।
[5 ] জ্ঞানের বিস্ফোরণ: মুদ্রণযন্ত্রের মাধ্যমে মুদ্রিত সস্তা প্রচুর সংখ্যক বই সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছালে ইউরোপে জ্ঞানের বিস্ফোরণ ঘটে। বইয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন শাখার জ্ঞান মানুষের নাগালে আসে। নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, মতবাদ ও ভৌগোলিক অভিযানগুলির কাহিনি বইয়ের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষ জানতে পারে।
h) ডাইনিবাদ কী?
3. যে কোন একটি প্রশ্নের উত্তর দাও :- (8×1=8) (1st+3rd)
a) মোগল আমলে মনসবদারি প্রথার বিবর্তন আলোচনা করো । ****
b) ভৌগলিক অভিযানের কারন আলোচনা করো। ***
Answer:- পঞ্চদশ শতকে সামুদ্রিক অভিযান এবং নতুন নতুন দেশ আবিষ্কারে ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ করে । এই সময় স্পেন, পোর্তুগাল, হল্যান্ড প্রভৃতি দেশ সমুদ্রাভিযান ও ভৌগোলিক আবিষ্কারের নেশায় মেতে ওঠে।
● ভৌগোলিক আবিষ্কারের কারণ:-
(1 ) বাণিজ্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা: বাণিজ্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পঞ্চদশ শতকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃদ্ধি করেছিল। অন্য দেশকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হারিয়ে নিজের দেশের বাণিজ্যিক উচ্চাশা পূরণ করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশ নতুন নতুন দেশের বাজারের সন্ধান করতে সমুদ্রে পাড়ি দেয়।
[2] নতুন পথের সন্ধান লাভ: তুর্কিদের আক্রমণে কনস্ট্যান্টিনোপলের পতন (১৪৫৩ খ্রি.) ঘটলে প্রাচ্যের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য ইউরোপীয়রা ভূমধ্যসাগরের বাণিজ্যপথ ব্যবহারের সুযোগ হারায়। তাই নতুন পথের সন্ধান পেতে ইউরোপের বণিকরা আকুল হয়ে ওঠে।
[3] নবজাগরণের প্রভাব: নবজাগরণ মানুষের মধ্যে নিয়ে এসেছিল নতুন করে জানা ও বোঝার আগ্রহ। এই আগ্রহ থেকেই পশ্চিম ইউরোপের মানুষের মধ্যে পৃথিবীর অজানা অঞ্চলগুলির সম্বন্ধে জানার আগ্রহ তৈরি হয়।
[4] পর্যটকদের বিবরণীর প্রভাব: পঞ্চদশ শতকে ইউরোপের নবজাগরণের প্রভাবে বিভিন্ন ভ্রমণবৃত্তান্ত প্রকাশিত হয়। মার্কোপোলো, জরদ্যাঁ, জুরারা প্রমুখের ভ্রমণকাহিনি থেকে বিশ্বের দূরবর্তী প্রান্তগুলি সম্পর্কে ইউরোপের মানুষের কৌতূহল বাড়ে। অজানাকে জানার এবং অচেনাকে চেনার এক অদম্য ইচ্ছা ইউরোপকে আবিষ্ট করে।
[5 ] বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও নতুন জ্ঞানচর্চা: বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, ভৌগোলিক জ্ঞানবৃদ্ধি, জ্যোতির্বিদ্যাচর্চার উন্নতি সমুদ্রাভিযানকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছিল। কম্পাসের আবিষ্কার, অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ নির্ণয়ের জন্য অ্যাস্ট্রোল্যাবের আবিষ্কার, উন্নত মানচিত্রের প্রকাশ প্রভৃতি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলি নাবিকদের অজানা সমুদ্রে পাড়ি দেওয়ার দুঃসাহস জোগায়। পৃথিবী গোলাকাকার বলে তুলে ধরে গ্যালিলিওর বক্তব্য নাবিকদের অভিযানে বিশেষভাবে সহায়তা করে।
[6] ধর্মীয় প্রেরণা: কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের (১৪৫৩ খ্রি.) ইউরোপে ইসলামের প্রবেশ ঘটলে ইসলাম ধর্মকে প্রতিহত করে খ্রিস্টান ধর্মের প্রসার ঘটানো বিশেষভাবে প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
c) কৌটিল্যের রাষ্ট্রচিন্তা বা সপ্তাঙ্গ তত্ব আলোচনা করো। ****
d) ধর্মসংস্কার আন্দোলনে মার্টিন লুথারের অবদান আলোচনা করো। ****
Answer:- জার্মানিতে প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলনের জনক ছিলেন মার্টিন লুথার। 1483 খ্রি: জার্মানির একটি কৃষক পরিবারে তিনি জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পছন্দের বিষয় ছিল ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন । পাশাপাশি তিন্ আরিস্টটল, উইলিয়াম প্রমুখ দার্শনিকের আদর্শ দ্বারা বিশেষ ভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন।
● ধর্মীয় বিশ্বাস ও আদর্শ :-
প্রথমত, " ঈশ্বরে ভক্তি ও বিশ্বাসই প্রোটেস্ট্যান্ট মতাদর্শের প্রধান ভিত্তি । লুথারের এই তত্ত্বের উৎস হল সেন্ট পলের ( St. Paul ) রচনা । লুথার মনে করতেন যে মানুষের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই । সে ঈশ্বরের করুণার উপর নির্ভরশীল । কাজেই ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি ও অগাধ বিশ্বাসই তার মুক্তির একমাত্র পথ । একমাত্র এইভাবেই ঈশ্বরের সঙ্গে মিলন সম্ভব ।
দ্বিতীয়ত , লুথার বিশ্বাস করতেন যে , সত্যের একমাত্র উৎস ঈশ্বরের মুখনিঃসৃত বাণী , যা সংকলিত রয়েছে বাহবেলে । তাই প্রত্যেকের কর্তব্য বাইবেল পাঠ করা ও তার নির্দেশ অনুসরণ করা উচিত।
তৃতীয়ত , লুথার মনে করতেন ঈশ্বরের কৃপা ও করুণা ছাড়া মানুষের পক্ষে অন্ধকার থেকে আলোয় আসা , অজ্ঞানতা থেকে জ্ঞানের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব । সাধারণ মানুষের নিজস্ব বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি নেই ।একমাত্র ঈশ্বরের করুণা ও অনুগ্রহের সাহায্যেই সে সত্য দর্শন করতে পারে ।
ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের মিলন ও তার মুক্তির জন্য লুথার তিনটি সূত্রের কথা বলেছিলেন । সেগুলি হল—
( ১ ) Sola fide বা কেবলমাত্র ভক্তি ও বিশ্বাস , এর মাধ্যমে তিনি যুক্তির পরিবর্তে বিশ্বাসের উপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
( ২ ) Sola scriptura বা কেবলমাত্র শাস্ত্রপাঠ ও
( ৩ ) Sola gratia বা কেবলমাত্র ঈশ্বরের অনুগ্রহ ও কৃপা ।
● চার্চের সঙ্গে লুথারের বিরোধ :-
প্রথম দিকে লুথার চার্চের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বা চার্চের সঙ্গে কোনো বিচ্ছেদ চাননি । তিনি নিজে এজন যাজক ও সন্ন্যাসী ছিলেন । কিন্তু ১৫১৭ সালের একটি ঘটনা তাঁকে বিচলিত করে ।ওই বছর পোপ দশম লিও ( Leo ) রোমের সেন্ট পিটার চার্চ নতুন করে নির্মাণ করার জন্য indulgence বা পাপমুক্তিপত্র বিক্রয় করে অর্থ সংগ্রহ করতে ব্রতী হন । লুথার সঙ্গে সঙ্গে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এবং এইভাবে অর্থ সংগ্রহকে তিনি অনৈতিক বলে অভিহিত করেন । পোপের এই ধরনের কোনো ক্ষমতা আছে বলে লুথার বিশ্বাস করতেন না ।
● পচানব্বই দফা থিসিস :-
এই পরিস্থিতিতে ১৫১৭ সালের ৩১ অক্টোবর ভিটেনবার্গ গির্জার দরজায় লুথার তাঁর বিখ্যাত ৯৫ দফা ' থিসিস ' টাঙিয়ে দেন এবং পরে তা ছাপাখানার মাধ্যমে দ্রুত বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে । এইভাবে জার্মান সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হয় । এই থিসিসটি প্রথমে ল্যাটিন ভাষায় লেখা হলেও পরে তা জার্মান ভাষায় অনুদিত হয় । পাপমুক্তিপত্র বিক্রয়ের বিরুদ্ধে লুথারের এই প্রতিবাদী কণ্ঠ তাকে রাতারাতি বিখ্যাত করে তোলে এবং চতুর্দিকে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে ।
● প্রোটেস্ট্যান্টবাদের জন্ম :-
লুথার যেভাবে পোপতন্ত্র ও চার্চকে আক্রমণ করেন , তা পোপের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না । তিনি তাঁকে চার্চ থেকে বহিষ্কার করেন এবং এক অধিবেশনে লুথারকে সমাজচ্যুত বলে ঘোষণা করা হয় । লুথার অবশ্য এতে বিচলিত হননি এবং পোপের হুকুমনামা বা নির্দেশ আগুনে পুড়িয়ে দেন । এই অবস্থায় লুথার জার্মান ভাষায় বাইবেল অনুবাদের কাজে ব্রতী হন এবং গ্রিক থেকে জার্মান ভাষায় New Testament অনূদিত হয় । লুথারের অনুবাদ জার্মানিতে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ।ফলস্বরুপ ১৫২৬ সালে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের স্পেয়ার ( Speyer ) অধিবেশনে জার্মান রাজন্যবর্গ ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট — এই দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।লুথারপন্থীরা প্রোটেস্ট্যান্ট নামে পরিচিত হয় ।
● উপসংহার :-
লুথার চার্চের মতাদর্শের মূল ভিত্তি আক্রমণ করলেও কোনো ব্যাপক পরিবর্তনের কথা বলেন নি । আসলে লুথার যতটা বিশ্বাস ও ভক্তির উপর জোর দিয়েছিলেন , চার্চের আনুষ্ঠানিক আচার ও রীতিনীতি নিয়ে ততটা মাথা ঘামাননি । লুথারের মূল লক্ষ্য ও আগ্রহ ছিল ধর্মীয় সংস্কার ।