1. কেন এল না’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কেন এল না’ কবিতাটির নামকরণ বিষয়বস্তু ও আবেগের দিক থেকে অত্যন্ত সার্থক ও ব্যঞ্জনাময়। এই নামটির মধ্য দিয়ে অভাব, গভীর উৎকণ্ঠা এবং অনিশ্চয়তার এক ছবি ফুটে উঠেছে। পুজোর মুখে বাবার বাড়ি না ফেরায় বাচ্চার অপেক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত অন্য একটি ছেলের "না ফেরার" বেদনার ইতিহাস এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
নামকরণ সার্থকতার কারণসমূহ:
গভীর প্রতীক্ষা ও উৎকণ্ঠা: কবিতার শুরুতে "কেন এল না" প্রশ্নটি ছেলের বাবা না ফেরার উৎকণ্ঠার প্রতীক, যা সারাটা দিন ধরে চলে।
অভাব ও অনিশ্চয়তা: মাইনে নিয়ে সকালে ফেরার কথা থাকলেও, সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলেও বাবা না ফেরায় পরিবারের আর্থিক অভাব এবং অনিশ্চয়তার ভয় এই নামে ফুটে ওঠে।
বিষাদের বার্তা: কবিতার শেষে যখন বাবা ফেরেন, তখন অন্য এক 'ছেলে'র না ফেরার খবর সামনে আসে। ফলে, 'না আসা'র এই বিষয়টি ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সামাজিক বেদনায় রূপ নেয়।
কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনের এই আশা-নিরাশার দোলাচলকে তুলে ধরার জন্য "কেন এল না" নামটি অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন, যা কবিতার মূল ভাবকে পূর্ণতা দিয়েছে।কেন এল না’- নামটি পুরো কবিতার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন, যে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি কবিতাজুড়ে। কবি কেবল সাধারণ মধ্যবিত্ত নিরপরাধ মানুষগুলোর ঘরে না ফেরার নির্মম সত্যটুকুই তুলে ধরেছেন কবিতায় আর সমগ্র সমাজের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন তারা ‘কেন এল না?’- যে প্রশ্নের বিপরীতে রয়েছে তৎকালীন অস্থিরতার সময়, পুলিশি অত্যাচার, গণহত্যা যা ছেলেটির না ফেরার কারণ। কবিতার নামটি তাই কেবল একটি সাধারণ প্রশ্ন নয় বরং এক বেদনার্ত ক্রন্দন যা মানবতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। একটি নিষ্পাপ প্রাণ, যে রাজনৈতিক আন্দোলনের শরিক নয়, সরকারের সঙ্গে যার কোনো বোঝাপড়া নেই- সে কেন এলনা? কেন হারিয়ে গেল মৃত্যুর অতলে চিরতরে? এই প্রশ্ন কবিতার অন্তর্নিহিত বেদনাকে, সমাজের মানবতাহীন সত্তাটিকে আরও দৃঢ় করে পাঠকের সামনে তুলে ধরে।
2. হলুদ পোড়া' গল্পটির নামকরণের সার্থকতা লেখ।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'হলুদ পোড়া' গল্পটি গ্রামীণ কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস এবং অন্ধকারের মধ্যে যন্ত্রণাদায়ক বাস্তবতার এক সার্থক দলিল। গল্পে হলুদ পোড়ার ধোঁয়া ব্যবহার করে রোগ মুক্তির যে চেষ্টা, তা অবৈজ্ঞানিক ও ভয়ের প্রতীক । কুসংস্কারের আগুনে জ্বলতে থাকা গ্রামীণ সমাজের করুণ রূপ এবং শেষ পর্যন্ত জীবনের ক্ষয়—এই নামকরণে বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে।
প্রতীকী অর্থ: হলুদ সাধারণত শুদ্ধতা ও শুভার প্রতীক হলেও, এখানে তা পোড়ানোর মাধ্যমে অদৃশ্য ভয় বা অশুভ শক্তির প্রতিরোধের চেষ্টা বোঝায়, যা কুসংস্কারের গভীরতা নির্দেশ করে।
কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু: পুরো গল্পটি মূলত কুঞ্জ গুণী এবং গ্রামের মানুষদের এই অশুভ বা কুসংস্কারাচ্ছন্ন 'হলুদ পোড়া' বা ধোঁয়া দিয়ে শুভ্রার মতো চরিত্রকে সুস্থ করার প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।
বাস্তবতার প্রতিফলন: আধুনিক চিকিৎসার বদলে গাঁজাখুরি চিকিৎসা এবং অন্ধবিশ্বাসের কারণে মানুষের অসহায়ত্ব ও মৃত্যুর যন্ত্রণাকে 'হলুদ পোড়া' নামকরণে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
গল্পের শুরু হয় কার্তিক মাসে হঠাৎ ঘটে যাওয়া দুটো খুনের ঘটনাকে ঘিরে। প্রথমে খুন হন বলাই চক্রবর্তী-তিনি ছিলেন এক মধ্যবয়স্ক/মাঝ-বয়সি যোয়ান মদ্দ পুরুষ। তিন দিন পর খুন হয় শুভ্রা, ষোল-সতের বছরের এক ভীরু স্বভাবের মেয়ে। এই দুটি মৃত্যুর মধ্যে সম্পর্ক কী?-তা নিয়ে গোটা গ্রাম জুড়ে নানা গুজব, সন্দেহ ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়। শুভ্রার বিবাহ হয়ে গিয়েছিল এবং বছর দেরেক সে তার শ্বশুরবাড়িতেই ছিল। পরে সাত মাসের গর্ভবর্তী অবস্থায় সে বাপের বাড়ি আসে, তার দাদা ধীরেন চাটুয্যের কাছে, ধীরেনের স্ত্রী ছিলেন শান্তি। আর বলাই চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর তাঁর ভাইপো নবীন চক্রবর্তী বলাইয়ের সমস্ত সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পায়। নবীনের স্ত্রী ছিলেন দামিনী।
গ্রামের বিশ-ত্রিশ বছরের মধ্যে কেউই গুরুতর যখন হয়নি সেইখানে পরপর দু'দুটো খুন হয়ে গেছে। শুভ্রার মৃত্যুর পর পাড়ায় নানা গুজব ছড়াতে থাকে। একুশ দিন পর, এক সন্ধ্যায় দামিনীর ওপর শুভ্রার অশরীরী আত্মা ভর করে। তখন নামকরা গুণী কুঞ্জকে ডেকে আনা হয়। কুঞ্জ যখন কাঁচা হলুদ পুড়িয়ে তার নাকের কাছে ধরেন, তখন দামিনীর কণ্ঠে শোনা যায় শুভ্রার স্বীকারোক্তি- "আমি শুভ্রা.. আমায় মেরো না... বলাই খুড়ো আমায় খুন করেছে।"
কিন্তু সমস্যা হলো-বলাই তো শুভ্রার খুনের তিন দিন আগেই মারা গেছে! ফলে রহস্য আরও গভীর হয়। বুড়ো ঘোষাল বলে যে, বলাই হয়তো কোনো জীবিত মানুষকে ভর করে শুভ্রাকে খুন করেছে। শুভ্রার এই স্বীকারোক্তিতে তখন সব দোষ এসে পড়ে ধীরেন চাটুয্যের ওপর, এবং তাকে ঘিরে গ্রামে নানা কটুক্তি শুরু হয়। ধীরে ধীরে ধীরেন গ্রামে অপমান ও ব্যঙ্গের পাত্র হয়ে এবং গ্রামে একঘরে হয়ে পড়ে।
এরপর গল্পের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। ক্ষেন্তি পিসি পরামর্শ দেয় যে একটি নতুন বাঁশ কেটে তার আগা ও মাথা পুড়িয়ে ঘাটের পথে আড়াআড়ি ফেলে রাখতে। কারণ কোনো অশরীরী সেই বাঁশ পার করতে পারবে না। সন্ধ্যা থেকে ধীরেনের পরিবারের কারও ওই বাঁশ ডিঙ্গিয়ে বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু একদিন আকাশে তখনও শেষ আলো মিলিয়ে যায়নি, ধীরেন ভাবে-জীবিত ও মৃতের সংযোগ স্থাপনের সবচেয়ে প্রশস্ত সময় হলো সন্ধ্যা।
ভরসন্ধ্যাতেই যেহেতু শুভ্রা দামিনীকে ভর করেছিল, তাই ধীরেন মনে করে তার সঙ্গে শুভ্রার কথা বলার সুযোগ দেওয়া/পাওয়া উচিত। এই ভেবেই সে বাঁশ ডিঙ্গিয়ে মাঠের দিকে এগিয়ে যায়। হঠাৎ শোনা যায় হিংস্র জন্তুর গর্জনের মতো আওয়াজ। শান্তি তখন বলে ওঠে- "বাঁশটা ডিঙ্গিয়ে চলে এসো! পড়ে গেছো নাকি?", ধীরেন উত্তর দেয়-"ডিঙ্গোতে পারছি না। বাঁশ সরিয়ে দাও।" এরপর ধীরেন তীক্ষ্ণ গলায় আর্তনাদ শুরু করে। শান্তি সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে যায় যে কোনো অশরীরী শক্তি তাকে ভর করেছে।
তখন চারদিক থেকে গ্রামের লোকজন জড়ো হয়। আসে গুণী কুঞ্জ। মন্ত্রপাঠ, আগুনে শিকড়-পাতা পোড়ানো আর ঘণ্টাখানেকের চেষ্টা শেষে তিনি ধীরেনকে শান্ত করতে সক্ষম হন। এরপর কাঁচা হলুদ পুড়িয়ে ধীরেনের নাকে ধরে তুই কে? জিজ্ঞাসা করলে ধীরেনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে আসল সত্য- "আমি বলাই চক্রবর্তী! শুভ্রাকে আমি খুন করেছি।" অর্থাৎ, ওই সন্ধ্যা বেলাতে বলাই চক্রবর্তীর র অশরীরী। অশরীরী আত্মা বা ভূত ধীরেনের উপর ভর করে।
অতএব, গল্পের শুরুতেও রহস্য উন্মোচনে 'হলুদ পোড়া' ব্যবহৃত হয়েছে, আবার শেষেও খুনের আসল রহস্য উদঘাটনে এই 'হলুদ পোড়া'ই ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও এ সবই লোকবিশ্বাস-কুসংস্কার, তবুও এই কুসংস্কার-বিশ্বাসকেই লেখক গল্পের ভৌতিক আবহকে আরও দৃঢ় ও বাস্তব করে তুলতে নিপুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন।
সামগ্রিকভাবে, গল্পটির মূল বিষয়বস্তু, চরিত্রদের মানসিকতা এবং গ্রামীণ অন্ধকারের প্রেক্ষাপটে 'হলুদ পোড়া' নামকরণটি অত্যন্ত সার্থক হয়েছে।
3. ডাকঘর নাটকের নামকরণের সার্থকতা লেখ।
ডাকঘর নাটকের নামকরণ সার্থক কারণ নাটকের মূল ঘটনাবলী এবং ভাববিন্যাস "ডাকঘর" কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। নাটকে ডাকঘর একটি প্রতীকী স্থান হিসেবে কাজ করে, যেখানে মানুষের স্বাধীনতা, যোগাযোগ এবং তথ্য আদান-প্রদান ঘটে। নাটকের কেন্দ্রীয় ঘটনা হলো রাজার চিঠি ডাকঘরের মাধ্যমে অমলের কাছে পৌঁছানো, যা নাটকের মূল কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
নাটকে রাজার চিঠি অমলের কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া নাটকের মূল কাহিনীকে গঠন করে। রাজার চিঠিটি প্রথমে ডাকঘরে আসে, যেখানে ডাকখানার কর্মীরা চিঠি প্রক্রিয়াকরণ করে। এরপর চিঠিটি ডাকখানার মাধ্যমে বিভিন্ন ধাপে অমলের কাছে পৌঁছায়।
এই প্রক্রিয়ায় নাটকে দেখানো হয়েছে কিভাবে ডাকঘর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যা দূরবর্তী স্থান থেকে তথ্য ও বার্তা পৌঁছে দেয়। নাটকের ভাষায়, রাজার চিঠি ডাকঘরের কর্মীদের মাধ্যমে সঠিকভাবে অমলের কাছে পৌঁছানো হয়, যা নাটকের সংঘাত ও উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু।
অর্থাৎ, ডাকঘর নাটকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং রাজার চিঠি অমলের কাছে পৌঁছানোর ঘটনাটি নাটকের মূল কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
ডাকঘর এখানে শুধু একটি স্থান নয়, বরং মানুষের জীবনে স্বাধীনতা ও শাসনের দ্বন্দ্বের প্রতীক। নাটকের মাধ্যমে দেখা যায় কিভাবে ডাকঘর মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং কিভাবে এটি স্বাধীনতা ও শাসনের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন সৃষ্টি করে। তাই নাটকের নাম "ডাকঘর" রাখা সম্পূর্ণ সার্থক এবং তা নাটকের ভাববিন্যাসের সঙ্গে সুসংগত।
১) “আমি রোজ লুকিয়ে লুকিয়ে গ্রিনরুমে ঘুমোই চাটুজ্জেমশাই-কেউ জানে না’– বক্তা গ্রিনরুমে ঘুমান কেন ? ৫
উত্তর: আলোচ্য অংশটির বক্তা অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নানা রঙের দিন’ নাটকের প্রম্পটার কালীনাথ সেন। নাটক শেষ হলে প্রতিদিন তিনি গ্রিনরুমকে ঘুমোনোর জায়গা হিসেবে ব্যবহার করেন, যদিও সে-কথা মালিক জানে না।
গ্রিনরুমে ঘুমোনোর কারণ: নাটক সমাপ্ত হয়ে যাওয়ার পরও ঘুম থেকে উঠে পেশাদারি থিয়েটারের ফাঁকা অন্ধকার মঞ্চে যখন একাকী রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায় অস্থির, ভীত, বেসামাল এবং তিনি উইংস দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করলে ময়লা পাজামা ও কালো চাদর গায়ে এলোমেলো চুলে আর-এক বৃদ্ধ এসে ঢোকেন। তিনি প্রম্পটার কালীনাথ সেন। প্রথমে বৃদ্ধ রজনীবাবু কালীনাথকে চিনতে পারেনি। পরে তার পরিচয় জানতে পারলে এত রাতে তিনি কী করছেন জানতে চাইলে বৃদ্ধ কালীনাথ সেন জানান তার শোয়ার জায়গা না-থাকায় তাকে গ্রিনরুমে ঘুমোতে হয়। তখন এই মানুষটির চালচুলোহীন হতদরিদ্র অবস্থাটি সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয়। নাটককে ভালোবেসে নিজের ব্যক্তিজীবনের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের দিকে তাকাননি কালীনাথ সেন। তাই তিনি রজনীবাবুকে বলেছেন গ্রিনরুমে ঘুমানোর কথাটা যেন মালিকের কানে না-যায়, তাহলে তিনি বেঘোরে মারা পড়বেন এবং শোয়ার জায়গাটুকু চলে যাবে। অর্থাৎ প্রশ্নোদ্ভূত উক্তির মধ্যে তৎকালীন সময়ে নাটকের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জীবনের দারিদ্র্য, অসহায়তা ও বঞ্চনার অন্ধকার দিকটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মঞ্চের বাইরে বা মঞ্চের নেপথ্যে অন্ধকারে থাকা নাট্যকর্মীদের মতো কালীনাথের জীবনও অন্ধকারাচ্ছন্ন। সে অজস্র বঞ্চিত, অবহেলিত, অর্ধাহারী, দুর্দশাগ্রস্ত নাট্যকর্মীদের প্রতিনিধি। সামান্য মাইনেতে যার বেঁচে থাকা, টিকে ∎ থাকার লড়াই চলে। কেবল শিল্পের প্রতি ভালোবাসা তাকে এ পেশায় ধরে রেখেছে। রাত্রে শোয়ার জায়গা নেই বলে রোজ রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে গ্রিনরুমে ঘুমোয় সে। দীর্ঘকাল নাট্যদলে নিরলস পরিশ্রম করলেও নাট্যদল তার জন্য জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। এই অসহায়তাই তাকে 'লুকিয়ে ঘুমোতে' বাধ্য করে।
(২) “অভিনেতা মানে একটা চাকর-একটা জোকার, একটা ক্লাউন। লোকেরা সারাদিন খেটেখুটে এলে তাদের আনন্দ দেওয়াই হল নাটকওয়ালাদের কর্তব্য।”- বক্তার কথার তাৎপর্য আলোচনা করো। [সংসদ নমুনা প্রশ্ন] ৫
[অথবা],
“দেয়ালে অঙ্গারের গভীর কালো অক্ষরে লেখা, আমার জীবনের পঁয়তাল্লিশটা বছর”– ‘নানা রঙের দিন’ নাটক অবলম্বনে উদ্ধৃতাংশটির তাৎপর্য আলোচনা করো। ৫
জানো, কালীনাথ, একটা মেয়ে!"- এই মেয়েটির কথা যেভাবে বক্তা কালীনাথকে বর্ণনা করেছেন তার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও? রজনীর জীবনে এই মেয়েটির প্রভাব আলোচনা করো।
[WBCHSE '23] ২+৩
অথবা, "ওরই মধ্যে কোথায় যেন আগুন লুকিয়ে ছিল"- কোন্ প্রসঙ্গে কে এই কথাটি বলেছে? বক্তার এরূপ মন্তব্যের কারণ কী?
উত্তর: প্রসঙ্গ: ‘নানা রঙের দিন’ নাটকে নাট্যকার অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় এক বৃদ্ধ প্রতিভাবান অভিনেতার জীবননাট্যকে উন্মোচন করেছেন। এ নাটকের প্রধান চরিত্র রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। তিনি একদিন অভিনয় শেষে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গ্রিনরুমে ঘুমিয়ে পড়েন। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে উঠে ফাঁকা মঞ্চে দাঁড়িয়ে একাকিত্বে-হতাশায় তিনি প্রম্পটার কালীনাথ সেনের কাছে নিজের বর্ণময় অতীতের স্মৃতিচারণ করতে শুরু করেন।
তাৎপর্য: রাঢ় বাংলার এক ভদ্র ব্রাহ্মণ বংশে রজনীকান্ত জন্মেছিলেন। কিন্তু নাটকের প্রতি অদম্য ভালোবাসায় রজনীকান্ত পুলিশের চাকরি ছেড়ে দেন। নাটককে অবলম্বন করেই যশ-প্রতিপত্তি ও খাতিরে পূর্ণ হয়ে ওঠে তাঁর জীবন। এসময় একটি মেয়ে তাঁর প্রেমে পড়ে। স্বনামধন্য অভিনেতা রজনীকান্তের অভিনয়ে মোহিত হয়ে একটি মেয়ে নিজে থেকে তাঁর সঙ্গে আলাপ করেছিল। ধনী পরিবারের অল্পবয়সি সয়ে, ফর্সা সুন্দর, ছিপছিপে গড়ন, সহজসরল মনের অধিকারী। গ্রীষ্মের ধকেলে সূর্যাস্তের মেঘে যেমন অস্তমিত সূর্যের তেজ কোনো অংশে কম থকে না, তেমনই রজনীকান্তের মনে হয়েছিল আপাত সহজসরল মনের। বিয়ের স্বপ্ন দেখেন রজনীকান্ত, কিন্তু বিয়ের আগে থিয়েটার ছাড়ার প্রস্তাব মেনে নিতে পারেন না। সেদিন তিনি উপলব্ধি করেন অভিনেতার কদর শুধু মঞ্চে। অভিনেতা আসলে একজন ভাঁড়, যার কোনো সামাজিক স্বীকৃতি বা সম্মান নেই। এরপর থেকে এলোমেলো হয়ে ওঠে রজনীকান্তের অভিনয় জীবন। তিনি আবোলতাবোল সব পার্ট করতে থাকেন। ক্রমশ ব্যক্তিগত জীবনে একাকিত্ব ও হতাশায় তিনি ডুবে যেতে থাকেন। এই আঘাত-যন্ত্রণা ও নিঃসঙ্গতাকেই তিনি প্রেক্ষাগৃহের দেয়ালে দেয়ালে কালো অঙ্গারে ফুটে উঠতে দেখেছেন।
(৩) নানা রঙের দিন’ নাটক অবলম্বনে রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রবিশ্লেষণ করো। [সংসদ নমুনা প্রশ্ন] ৫
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নানা রঙের দিন’ নাটকটির প্রধান চরিত্র বৃদ্ধ অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। ফাঁকা প্রেক্ষাগৃহে নেশাগ্রস্ত, নিঃসঙ্গ রজনীকান্তের চরিত্রের নানান দিক তাঁর স্মৃতিচারণার সূত্র ধরে একে একে উন্মোচিত হয়।
নাটকের প্রতি দায়বদ্ধ: রাঢ় বাংলার ভদ্র ব্রাহ্মণ বংশজাত রজনীকান্ত অল্পবয়সেই পুলিশের ইনস্পেক্টর পদে চাকরি পেয়েছিলেন। কিন্তু নাটকের প্রতি অদম্য ভালোবাসার টানে তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। ক্রমে প্রতিভাবান অভিনেতা রজনীকান্ত শিল্পসৃষ্টির তাগিদে যৌবন-আদর্শ- শক্তি-সম্ভ্রম-প্রেম ও নারী এ সব কিছুকেই উৎসর্গ করেন।
নিঃসঙ্গ ও হতাশ : রজনীকান্ত উপলব্ধি করেন দর্শকের মনোরঞ্জনে অভ্যস্ত অভিনেতা আসলে এক ভাঁড় মাত্র, যার কোনো সামাজিক সম্মান নেই; কেবল রয়েছে সীমাহীন একাকিত্ব আর বয়সের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিভাকে হারানোর দুঃসহ গ্লানি ও হতাশা।
সংশয় ও দ্বন্দ্বে দীর্ণ: জীবনের শেষপ্রান্তে ধীরে ধীরে মৃত্যুর শিয়রে এসে উপস্থিত হওয়ার নৈরাশ্য রজনীকান্তকে আরও অস্থির ও বিচলিত করে তোলে। ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে তিনি ‘রিজিয়া’-র বক্তিয়ার কিংবা ‘সাজাহান’-এর ঔরঙ্গজীব বা শেকসপিয়রের ‘ওথেলো’-র মধ্য দিয়ে বার্ধক্য, ব্যাধি, একাকিত্ব ৪ এবং মৃত্যুভয়কে জয় করতে চান; আবার পরমুহূর্তেই স্মৃতি থেকে বাস্তবে ফিরে জীবনের বিদায়ধ্বনি শুনতে পান।
এভাবেই আক্ষেপ-ভালোবাসা-প্রতিভা ও নৈরাশ্যের দ্বন্দুময় টানাপোড়েনে এক নিঃসঙ্গ শিল্পীর অন্তরের একাকিত্বের অনুভূতির ভাষ্যকে প্রকাশ করেন অভিনেতা রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়।
**** বাংলা চিত্রকলাচচীর ধারায় শিল্পী নন্দলাল বসুর কৃতিত্ব আলোচনা করো।
উত্তর:
"তোমার তুলিকা রঞ্জিত করে
ভারত-ভারতী চিত্ত,
বঙ্গলক্ষ্মী ভান্ডারে সে যে
যোগায় নূতন বিত্ত।”
শিল্পী নন্দলাল বসুর প্রতি কবি রবীন্দ্রনাথের এই উক্তিটির মধ্য দিয়ে আমরা শিল্পী নন্দলাল বসুর প্রতিভার পরিচয় পাই। বাঙালির চিত্রকলাচর্চার পথে এক ভিন্নতর পথিক স্বভাবশিল্পী নন্দলাল বসু। মায়ের কাছ থেকে শিল্পীসত্তা পাওয়া এই চিত্রী, স্কুলের খাতায় নোট লেখার বদলে একমনে ছবি আঁকতেন। অতি শৈশবেই দুর্গা, গণেশ, হাতি, ষাঁড় প্রভৃতির মূর্তি বানিয়ে উৎসব ও মেলায় তা প্রদর্শন করতেন।
বিহারের মুঙ্গের থেকে কলকাতায় পড়তে এসে প্রথাগত পড়াশোনায় ব্যর্থ হন নন্দলাল-পরীক্ষায় পাশ করতে পারতেন না। তাই তিনি অঙ্কন শিক্ষাগ্রহণ করেন এবং একসময় শিল্পাচার্য-অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংস্পর্শে আসেন।
অবনীন্দ্রনাথের কাছে পাঁচ বছর অঙ্কন শিক্ষা নন্দলাল বসুর জীবন ও কর্মধারায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে। চিত্রকলা বিষয়ে তাঁর স্বাধীন চিন্তাভাবনার সূত্রপাত এখান থেকেই। তাঁর শিল্পীসত্তার পরিচয় মেলে সতী , শিবসতী , জগাইমাধাই, নটরাজের তাণ্ডব, জতুগৃহ, দাহ , অহল্যার শাপমুক্তি , যম ও নচিকেতা ইত্যাদি ছবিতে।বাঁধা ছকে না-চলা এই শিল্পী রূপনির্মাণে ও বর্ণবিন্যাসে সমকালীন শিল্পীদের থেকে ভিন্নপথে হেঁটেছেন।
নেচার স্টাডি: নন্দলালই প্রথম যিনি ভারতীয় শিল্পশিক্ষায় নেচার স্টাডির ওপর গুরুত্ব দেন। চিত্রী নন্দলাল বসু ভগিনী নিবেদিতার পরামর্শমতো গোয়ালিয়র গিয়ে অজন্তার গুহাচিত্র নকল করার কাজ করেন। বইয়ের প্রচ্ছদ অঙ্কন ও অলংকরণে তাঁর ব্যতিক্রমী প্রতিভা প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের 'সহজপাঠ'-এর নাম এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য। স্বদেশি ভাবনায় ভরপুর ছিলেন এই শিল্পী। তাঁর আঁকা সাদা-কালোয় চলমান লাঠি হাতে গান্ধিজির ছবিটি অহিংস আন্দোলনের আইকনে পরিণত হয়। আবার স্বাধীন ভারতের সংবিধান অলংকরণ ভারতরত্ন এবং পদ্মশ্রীর মতো বিভিন্ন পুরস্কারের নকশাও করেন তিনি।
সুগভীর নিষ্ঠার সঙ্গে সহজ আনন্দের মেলবন্ধনকারী শিল্পী নন্দলাল বসু শিল্পের ক্ষেত্রে চিরকালই আনন্দের বার্তা বহন করে যাবেন।
*** বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে জোড়াসাকো ঠাকুর বাড়ির অবদান আলোচনা করো ।
উত্তর:- বাঙালির বিজ্ঞানভাবনা ও বিজ্ঞানচর্চার সূচনা জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির পরিমন্ডলেই ঘটেছিল। ঠাকুর পরিবার থেকে প্রকাশিত বালক, ভারতী, সাধনা পত্রপত্রিকাতে বিজ্ঞান বিষয়ক বহু রচনা প্রকাশিত হত। কুসংস্কার দূরীকরণে দ্বারকানাথ ঠাকুরের ভূমিকা, চিকিৎসা শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর দান, শবব্যবচ্ছেদ প্রবর্তনে তাঁর প্রচেষ্টা, হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা ইত্যাদির কথা জানা যায়।
দ্বারকানাথের জ্যেষ্ঠপুত্র মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের প্রিয় বিষয় ছিল জ্যোতির্বিদ্যা। বিশ্বপরিচয় গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ পিতার এই বিশেষ দিকটির প্রতি আলোকপাত করেছেন। স্বর্ণকুমারী দেবীর জ্যোতিষশিক্ষাও দেবেন্দ্রনাথের হাত ধরে। তাঁর পৃথিবী (১২৮৯ বঙ্গাব্দ) গ্রন্থে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভূমিকাই মুখ্য। জ্যোতির্বিজ্ঞান ছাড়াও ভূতত্ত্বে, বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে দেবেন্দ্রনাথের প্রশ্নাতীত পাণ্ডিত্য ছিল। জ্ঞান ও ধর্মের উন্নতি বইতে ভূতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, জীবতত্ত্ব বিষয়ে তাঁর সেই অধিকারেরই প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
দ্বারকানাথের জ্যেষ্ঠপুত্র দেবেন্দ্রনাথের প্রিয় বিষয় ছিল জ্যোতির্বিদ্যা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তাঁর ভাইবোনেরা দেবেন্দ্রনাথের কাছে জ্যোতির্বিদ্যা শিক্ষা করেন। রবীন্দ্রনাথের প্রথম গদ্য রচনা জ্যোতির্বিজ্ঞানবিষয়ক এবং তা দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর আলাপচারিতারই ফসল। স্বর্ণকুমারী দেবী রচিত বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ 'পৃথিবী'-তে জ্যোতির্বিজ্ঞান-এর প্রভাব গভীরভাবে লক্ষ করা যায়। দেবেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ গণিত শাস্ত্রে বিস্ময়কর ব্যুৎপত্তির পরিচয় দেন। তিনি ইউক্লিডের জ্যামিতি নিয়ে আধুনিক চিন্তাভাবনা করেন। রবীন্দ্রনাথের সেজদা হেমেন্দ্রনাথ চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষার জন্য কিছুদিন মেডিকেল কলেজে অধ্যয়ন করেন। 'প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের স্থূলমর্ম' তাঁর লেখা একটি অনন্য গ্রন্থ।
বাল্যকালে রবীন্দ্রনাথকে বিজ্ঞানপাঠ ও অনুশীলনে ব্যাপৃত থাকতে দেখা যায়। পরবর্তী জীবনে বিজ্ঞানবিষয়ক যে সকল রচনা রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, তার মধ্যে রয়েছে বহুবিধ বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধ, বিজ্ঞান নিবন্ধের সমালোচনা এবং বিজ্ঞান গ্রন্থের ভূমিকা। তিনি 'বিশ্বপরিচয়' গ্রন্থে অপার বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচয় দিয়েছেন।
*** ৭.৪ বাঙালি বিজ্ঞান সাধক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর অবদান লেখো।
উঃ "যাঁরা বলেন যে, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা সম্ভব নয়, তারা হয় বাংলা জানে না, নয়তো বিজ্ঞান জানেন না" এই চিরস্মরণীয় উক্তিটি করেছিলেন উপমহাদেশের একজন শ্রেষ্ঠতম প্রতিভা সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তিনি বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞান সাধক।
বিজ্ঞান শিক্ষা: ১৯০৯ সালে হিন্দু স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করে ১৯১১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আই এস সি পরীক্ষায় ১ম স্থান অধিকার করেন। তারপর ১৯১৩ সালে গণিতে অনার্স নিয়ে শীর্ষস্থান, এবং ১৯১৫ সালে মিশ্র গণিতে বিজ্ঞান স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় পাশ করেন।
বিজ্ঞানচর্চা: ১৯২৯ খ্রিঃ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার 'রিডার' হিসাবে যোগদান করেন। ২৪ বছর গবেষণায় তিনি বহু মূল্যবান সূত্র আবিষ্কার করেন। যার মধ্যে অন্যতম 'এক্স রে ক্রিস্টালোগ্রাফি'। এছাড়াও তিনি তাঁর পৃথিবী বিখ্যাত 'বোস সংখ্যায়ন' গবেষণার জন্য চির শ্রদ্ধেয়। তিনি আবিষ্কার করেন ফোটনের সংখ্যায়ন নির্ধারণের বিষয়টি। এমনকি এক্ষেত্রে কণাবাদের উপর বিশেষ ভিত্তি দান করেন। এসব ছাড়াও বোসের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গবেষণার বিষয় হল মহাকর্ষ বল, বিদ্যুৎ চুম্বকীয় বল, সতেজ বল, ক্ষীণ বল- এগুলির একীকরণ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। সহকর্মী মেঘাদ সাহার সঙ্গে তিনি 'সাহা-বোস সমীকরণে' গ্যাসের অবস্থা বর্ণনা সংক্রান্ত তত্ত্ব উদ্ভাবন করেন এবং বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন।
সম্মান: ১৯২৯ খ্রিঃ বোস ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে পদার্থবিদ্যা শাখার সভাপতি হন। ১৯৪৫ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে যোগদান করেন। ১৯৫৮ খ্রিঃ তিনি লন্ডনে রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯৫৯ খ্রিঃ ভারত সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক রূপে নিয়োজিত করেন। কলিকাতা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে 'ডক্টর অব সায়েন্স' উপাধিতে ভূষিত করে। তিনি ভারত সরকারের 'পদ্মবিভূষণ' উপাধি লাভ করেন।
শেষকথা: রবীন্দ্রনাথও তাঁর প্রতি স্নেহশীল ও আকৃষ্ট ছিলেন। এমনকি তাঁর একমাত্র বিজ্ঞানগ্রন্থ "বিশ্বপরিচয়' তিনি সত্যেন্দ্রনাথ বসুকেই উৎসর্গ করে বলেছিলেন- " man of genius with a taste for literature and who is a scientist as well"।
*** বাঙালী চিত্রকলার ইতিহাসে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান আলোচনা করো।
উ:- নব্য ভারতীয় চিত্রকলার জনক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭১১৯৫১) তার চিত্রকলা ও রচনার মধ্যদিয়ে তুমুল আলোড়ন তুলে, হৈ-চৈ বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন শিশুদের মনোজগতে।
বাংলার শিল্পকলার ইতিহাসে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রয়েছে। এই পরিবারের যে কয়েকজন সদস্য চিত্রচর্চায় সুনাম অর্জন করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭১-১৯৫১)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন নব্যবঙ্গীয় চিত্ররীতির জনক তথা আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার পথপ্রদর্শক।
চিত্রচর্চা-আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলাচর্চার পুরোধা হলেন অবনীন্দ্রনাথ। পাশ্চাত্য চিত্ররীতির প্রতি আকর্ষণে তিনি বহু খ্যাতনামা শিল্পীর কাছে শিহ্মাগ্রহন করেন। শিল্পচর্চার প্রথম পর্যায়ে বিদেশি শিল্পীদের কাছে ড্রয়িং, প্যাস্টেল, অয়েল পেন্টিং, জলরং বিবিধ মাধ্যমে চিত্রাঙ্কন শেখেন। এরপর আইরিশ ইল্যুমিনেশন ও মুঘল মিনিয়েচারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ফলে তাঁর শিল্পীসত্তায় নতুনত্ব দেখা দেয়। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে বৈষ্ণব পদাবলিকে বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে তিনি আত্মবিকাশের পথ খুঁজে পান। '
চিত্ররীতির বৈশিষ্ট্য-(১) জলরঙে 'গুয়াশ' পদ্ধতিতে ছবি আঁকার মাধ্যমে প্রকাশ পায় তাঁর শিল্পচর্চার দক্ষতা। এই 'গুয়াশ' পদ্ধতি জাপানি চিত্রের মত নয়। (২) তাঁর ছবির মূল প্রাণশক্তি ছিল অনুভূতিগ্রাহ্যতা। (৩) তাঁর ছবিতে রয়েছে মুঘল মিনিয়েচরের প্রভাব। (৪) বারবার রঙ ধুয়ে ফেলতেন বলে, তাঁর ছবিতে রঙের চরিত্র হয়ে উঠল মৃদু ও মসৃন। (৫) চিত্রচর্চায় ভারতের ধ্রুপদি ও পৌরাণিক অতীতের প্রতি ঝোঁক তার চিত্রের একটি বৈশিষ্ঠ্য ।
অবনীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য রীতি ত্যাগ করে ভারতীয় ছবি নিয়ে চর্চা শুরু করলেন । রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে মুঘল রীতিতে তিনি এঁকেছিলেন কৃষ্ণলীলা এরপর তিনি আঁকলেন শ্বেত অভিসারিকা ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে অবনীন্দ্রনাথের আঁকা অন্তিম শয্যায় শাহজাহান ছবিটি রৌপ্য পদক পায়, বুদ্ধ সুজাতা ইংল্যান্ডের পত্রিকায় প্রশংসা পায় । তাঁর উল্লেখযোগ্য ছবিগুলি হল কালিদাসের ঋতু সংহার বিষয়ে চিত্রকলা শেষ যাত্রা এছাড়াও কচ ও দেবযানী ,ঔরঙ্গজেবের সম্মুখে দাঁড়ার ছিন্ন মুন্ড , ভারতমাতা ,পার্থসারথি, অশোকের রানী ,দেবদাসী ,কাজরি নৃত্য ,বন্দিনী সীতা ইত্যাদি।
*** বাংলা চলচিত্রের ইতিহাসে সত্যজিৎ রায়ের অবদান আলোচনা করো ।
যে বাঙালি চলচ্চিত্রকার আন্তর্জাতিক মহলে বাংলা সিনেমাকে পরিচিতি দিয়েছিলেন, তিনি হলেন সত্যজিৎ রায় (১৯২১- ১৯৯২)। তিনি একইসঙ্গে একজন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার, সাহিত্যিক, সঙ্গীত পরিচালক এবং গীতিকার। তাঁর হাতে বাংলা সিনেমার নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছিল।
উল্লেখযোগ্য সিনেমা:- সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে 'পথের পাঁচালী' (১৯৫৫)। কান চলচ্চিত্র উৎসবে এই সিনেমাটি 'দ্য বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট' শিরোপা পেয়েছিল। সত্যজিৎ রায়ের 'পথের পাঁচালী', 'অপরাজিত' ও 'অপুর সংসার'- এই তিনটি সিনেমাকে একত্রে অপু ট্রিলজি বলা হয়। তাঁর অন্যান্য ছবির মধ্যে রয়েছে 'জলসাঘর', 'পরশপাথর', 'চারুলতা', 'কাঞ্চনজঙ্ঘা', 'অরণ্যের দিনরাত্রি', 'অশনি সংকেত', 'জন অরণ্য', 'প্রতিদ্বন্দ্বী' 'তিন কন্যা', 'শতরঞ্জ কে খিলাড়ি', 'ঘরে বাইরে', 'শাখা প্রশাখা', 'নায়ক' ইত্যাদি। এছাড়া শিশু-কিশোরদের জন্য তৈরি 'গুপী গাইন বাঘা বাইন', 'হীরক রাজার দেশে', 'সোনার কেল্লা', 'জয় বাবা ফেলুনাথ' সিনেমাগুলি এখনো সমান জনপ্রিয়।
পুরস্কার ও সম্মাননা :- চলচ্চিত্রশিল্পে তাঁর অবদানের জন্য সত্যজিৎ রায় বহু পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি, ফ্রান্সের বিশেষ সম্মনসূচক পুরস্কার লেজিওঁ অফ অনার, ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে এবং বিশ্ব চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার একাডেমি (অস্কার) সম্মানসূচক পুরস্কার। এছাড়া মৃত্যুর কিছুদিন আগে তাঁকে ভারত সরকারের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন প্রদান করা হয়।
*** বাংলা চলচ্চিত্রে ঋত্বিক ঘটকের অবদান লেখ ।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ঋত্বিক ঘটক এক স্মরণীয় অধ্যায়। সত্যজিৎ রায়ের সমসাময়িক যুগে যারা বাংলা সিনেমা নির্মাণে অনন্যতার বিরল স্বাক্ষর রেখেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ঋত্বিক ঘটক অগ্রগণ্য।
বিংশ শতাব্দীর একজন বিখ্যাত বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক হলেন ঋত্বিক ঘটক। ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন নিমাই ঘোষের 'ছিন্নমূল' (১৯৫১) সিনেমার মধ্য দিয়ে। এখানে তিনি একই সঙ্গে অভিনয় ও সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। এরপর ১৯৫২ সালে তাঁর একক পরিচালনায় মুক্তি পায় 'নাগরিক' সিনেমাটি। সিনেমাটি ১৯৫২ সালে তৈরি হলেও তা যুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৭ সালে। ষাটের দশকে ঋত্বিক ঘটক পরপর তিনটি ছবি বানান 'মেঘে ঢাকা তারা, (১৯৬০), 'কোমল গান্ধার' (১৯৬১), এবং'সুবর্ণরেখা'। এই তিনটি চলচ্চিত্রকে একত্রে 'ট্রিলজি' বা 'ত্রয়ী চলচ্চিত্র' বলা হয়। সিনেমাগুলিতে তৎকালীন দেশভাগের যন্ত্রণা এবং উদ্বাস্তু জীবনের রুঢ় বাস্তবতা চিত্রিত হয়েছে। ১৯৭০ সালে তাঁর তৈরি 'তিতাস একটি নদীর নাম' এক অবিস্মরণীয় ও মহাকাব্যিক সৃষ্টি। ১৯৭৪ সালে 'যুক্তি-তক্কো আর গপ্পো' নামে তিনি আর একটি সিনেমা তৈরি করেন, এটিই তাঁর পরিচালিত শেষ ছবি।
ঋত্বিক ঘটক মনেপ্রাণে ছিলেন মার্কসীয় আদর্শে বিশ্বাসী। তাই তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্র গুলিতে বামপন্থা ও মানবতাকে তিনি কখনোই উপেক্ষা করে যেতে পারেননি। অনেক সমালোচক ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় অতি নাটকীয়তা ও ভারসাম্যহীনতার কথা বললেও আজকের দর্শক জানেন তিনি ছিলেন সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা একজন চিত্র পরিচালক। আবেগ মননে, সংলাপে, দৃশ্যের সংঘর্ষ নির্মাণে তাঁর সিনেমা ছিল অভিনব। তিনি সিনেমার মাঝে মাঝে এমন এমন কিছু কাব্য মুহূর্ত তৈরি করেন, যা দর্শকের মনকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়।
পুরস্কার ও সম্মাননা :- ১৯৭০ সালে ভারত সরকার তাকে শিল্পকলায় পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত করেন। 'হীরের প্রজাপতি' চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ শিশুতোষ চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। 'যুক্তি তক্কো আর গপ্পো' চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার বিভাগে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
No comments:
Post a Comment